তাবলীগের বর্তমান সংকটের নেপথ্যে কে?

হযরত আলী (রা) একটা কথা বলেছিলেন, “কোন মানুষকে চিনতে হলে তাকে কিছু সময়ের জন্য ক্ষমতা দিয়ে দাও।”

দাওয়াতের মেহনত বা তাবলীগ জামাত এমন একটা জামাত যা সর্বজনবিদিত, সর্বত্রস্বীকৃত। পুরো পৃথিবীব্যাপী চলা এই মেহনতকে আজ পর্যন্ত বাধাগ্রস্ত করতে পারেনি বিশ্বের কোন রাষ্ট্রের প্রশাসন। পুরো পৃথিবীব্যাপী এই মেহনত এতদিন চলে এসেছে কোন প্রকার ফেতনা ছাড়াই। কারণ এই কাজ নিয়ে তারা যতই গবেষণা করেছে, গুপ্তচরবৃত্তি করেছে, শুধুই সাদিগী (সরলতা) পেয়েছে এই মেহনতে। এরা নিজের কষ্টের টাকা খরচ করে, সুখ স্বাচ্ছন্দ্যের জীবন ছেড়ে সাধারণ জীবন যাপনে অভ্যস্ত হয়ে শুধু মানুষকে কল্যানের দিকে ডাকে, আল্লাহর হুকুমের দিকে ডাকে, রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের) তরীকার দিকে ডাকে। এটাই এদের একমাত্র উদ্দেশ্য। মানুষকে দুনিয়ামুখী থেকে আখিরাতমুখী করা, মাখলুকমুখী থেকে আল্লাহমুখী করা।

কোনকালেই ক্ষমতার কোন লোভ ছিল না এদের মধ্যে। নইলে এত জনসমর্থন থাকা সত্ত্বেও এরা কখনোই কোন রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেনি। কখনো রাজপথে নেমে নিজেদের দাবী আদায়ের জন্য কোন মিছিল মিটিং করেনি। কোন ফেতনার সম্মুখীন হলে, কোন কিছুর প্রয়োজন হলে তাদের একটাই শিক্ষা দেওয়া হয়েছে – রাতের আধারে আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করা আর দিনের আলোয় সবর করা। এই শিক্ষাই সব সময় দিয়ে এসেছে তাবলীগ।এই কারণে কোন রাস্ট্রের প্রশাসন এই মেহনতে বাধা সৃষ্টি করেনি কখনো। বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তে এই মেহনতের বরকতে আল্লাহপাক দ্বীনকে জিন্দা করেছেন, করছেন। আমার চোখের সামনে দেখা অসংখ্য সন্ত্রাসী, দ্বীন থেকে গাফেল মানুষগুলো দ্বীনের ছত্রছায়ায় এসেছেন এই মেহনতের হাত ধরে। এছাড়াও অসংখ্য বিধর্মী মুসলমান হয়েছেন এই দাওয়াতের মেহনতের কারণে।

তাহলে আজ কি হল এদের?

এই মেহনতে শুরু থেকে একটা কথা বার বার বলা হয়ে থাকে, মাশওয়ারা (পরামর্শ) করে কাজ করা। যেহেতু মানুষকে আল্লাহর দিকে ডাকা এটা কোন সাধারণ মানুষের কাজ নয়, নবীদের কাজ ছিল।

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পবিত্র কুরআনে রাসুলে কারিম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি যেন কোনো কাজ করার ক্ষেত্রে মুমিনদের সঙ্গে পরামর্শ ও মত বিনিময় করেন। পবিত্র কুরআনের সূরা আল-ইমরানের ১৫৯ নম্বর আয়াতের শেষাংশে বলা হয়েছে – “দ্বীনের ব্যাপারে বিভিন্ন পরামর্শে মুমিনদেরকে অন্তর্ভুক্ত করো। তারপর যখন কোন মতের ভিত্তিতে তোমরা স্থির সংকল্প হবে তখন আল্লাহর ওপর ভরসা করো। আল্লাহ তাদেরকে পছন্দ করেন যারা তাঁর ওপর ভরসা করে কাজ করে’।”

সূরা শুরার ৩৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহ পাক আরো বলেন, “মুমিন তারাই যারা তাদের রবের নির্দেশ মেনে চলে,নামায কায়েম করে এবং নিজেদের সব কাজ পরস্পর পরামর্শের ভিত্তিতে চালায়,আমি তাদের যা রিযিক দিয়েছি তা থেকে খরচ করে’।”

প্রায় শত বছর ধরে চলে আসা এই মেহনতে কোন আচড় আসেনি, তাবলীগের ইতিহাসে রক্তাক্ত হওয়ার নজির নেই কারণ এখানে সবকাজ মাশওয়ারা (পরামর্শ ) করে করা হয়েছে। সবসময় উলামায়ে কেরামের সাথে পরামর্শ মোতাবেক কাজ চলে এসেছে এই মেহনত। তাই তো এতদিন কোন ফেতনা সৃষ্টি হতে পারেনি এই কাজে। সবাই ভাই-ভাই হয়ে দিলে দরদ নিয়ে উম্মতকে জাহান্নামমুখী থেকে জান্নাতমুখী করতে ব্যস্ত থাকত। তারপর হঠাৎ একদিন ফেতনা সৃষ্টি করলেন একজন।

ভারতের মাওলানা সাদ সাহেব। হঠাৎ তিনি নিজেকে আমির (দলনেতা) দাবী করে বসলেন। যা বেশিরবভাগ মানুষ মেনে নিতে পারেনি। কারণ এই কাজের মুরব্বিরা আগথেকেই নির্ধারণ করে রেখেছিলেন এই কাজ এখন থেকে পরামর্শ মোতাবেক চলবে। কোন একক নেতৃত্ব থাকবে না এই কাজে।

কিন্তু তিনি মানলেন না। মাওলানা সাদ সাহেবের বাবা, তার দাদা, এমনকি তার দাদার বাবার সাথে যারা কাজ করেছেন, সবাই তাকে বুঝাতে চেস্টা করলেন, কিন্তু তিনি বুঝলেন না। তিনি তার দাবীতে অনড়। এই ভদ্রলোকের মুখ ফসকে বিভিন্ন সময় কুরআন, হাদিসের অপব্যাখ্যা মুলক কথা বের হয়েছে। কখনো আল্লাহর ব্যাপারে, কখনো আম্বিয়ায়ে কেরামের ব্যাপারে, কখনো সাহাবাদের ব্যাপারে। সেজন্য উপমহাদেশের সবচেয়ে প্রসিদ্ধ মাদ্রাসা “দারুল উলুম দেওবন্ধ” তার বিপক্ষে বিভিন্ন সময় ফতওয়া দিয়েছে। তার মুখ ফসকে কুরআন,হাদিসের অপব্যাখ্যামুলক কথার জন্য তাকে রুজু করতে বলেছে। তার দাবী তিনি রুজু করেছেন, দেওবন্ধ মাদ্রাসার দাবি তার রুজুর ধরণ গ্রহণযোগ্য নয়।

তাবলিগ জামাতে এখন দুইটা অংশে পরিনত হয়েছে। এক অংশ হল – যারা এই ক্ষমতালোভী সাদ সাহেবের অনুসারী বা এতায়াতি গ্রুপ বলা হয় এদের। অন্য অংশ আছে উলামায়ে কেরামের মাতাহাতে। অর্থাৎ এরা উলামায়ে কেরামের পরামর্শ মোতাবেক চলবে। আর এই অংশের সাথে পুরো আলেমসমাজের অধিকাংশই আছেন।

কিছু অনলাইন পোর্টালে দেখলাম সাদপন্থি ও যোবায়েরপন্থি বলা হচ্ছে। যোবায়েরপন্থি আবার হল কোত্থেকে? সাদ সাহেব আমির (দলনেতা) হতে চেয়েছেন, যোবায়ের সাহেবসহ অন্যান্য সব বড় বড় আলেমরা চেয়েছেন সবাই মিলে মিশে দলবদ্ধভাবে কাজ করতে।

সমস্যার শুরু এখানেই। এই সাদ সাহেবকে যখন আমির মানতে মানুষ অস্বীকার করল, তখন তিনি বললেন, “তো ফির জাহান্নাম মে যাও” (আমির না মানলে জাহান্নামে যাও)। একজন মুমিন কখনো অন্য কলেমাওয়ালার জন্য জাহান্নাম কামনা করার ধৃষ্টতা দেখাতে পারে না।

একজন মুমিন জানে, সে আল্লাহর জন্য দুনিয়ার মানুষের সামনে ছোট হলে আল্লাহর কাছে সে বড় হবে। আল্লাহর জন্য এই কুরবানী বিনিময় আল্লাহ তাকে তাকে কাল আখিরাতে দিবেন জান্নাত দিয়ে। কিন্তু সেই বিশ্বাস তার কতটুকু আছে সেটা বড়ই প্রশ্ন।

যেই মানুষটা ক্ষমতার মোহে অন্ধ হয়ে গেছে, তার কাছে দুনিয়ার চাকচিক্যই সবকিছু। ফেরাউনও রাতের আধারে আল্লাহর কাছে দুনিয়া চাইত, আখিরাতে কিছুই তার দরকার নেই।

একটা মানুষের কারনে আজ ভাইয়ে ভাইয়ে রক্তপাত হল। আর তিনি তখন সুদুর ভারতে বসে আরাম করছেন। আল্লাহপাক কি দেখছেন না এটা? হুম দেখছেন।

এই লোকটা যদি একবার বলত, আমি আমির হব না। মিলেমিশে পরামর্শ মোতাবেক কাজ করব। তোমরা ভাই-ভাই আবার এক হয়ে যাও। চল, নিজে জাহান্নাম থেকে বাচি, উম্মতকে জাহান্নাম থেকে বাচানোর ফিকির করি। তাহলে সব ফেতনা শেষ হয়ে আবার সবাই এক হয়ে যেত। ভাইয়ে ভাইয়ে মিলে যেত।

এতদিনের ভালবাসার এই মেহনতে আবার জোয়ার উঠত। ক্ষমতা মানুষকে তার যোগ্যতা বুঝিয়ে দেয়।

(কখনো ভাবিনি কথাগুলো এভাবে লিখতে হবে। অনেক কষ্ট নিয়ে বাধ্য হয়ে লিখতে হয়েছে। রক্তাক্ত ইজতেমার ময়দান…… কখনো কারো কল্পনাতেও ছিল না)

(লিখাটি সম্পুর্ণ কপিপেস্ট করে টাইমলাইনে শেয়ার করে অন্যদের জানিয়ে দিয়ে দিন।)

Facebook Comments
28Shares

LEAVE A REPLY