মাঠে যা দেখলাম ( তালিগের প্রত্যক্ষদর্শী )

প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে এ ইতিহাস টুকে রাখা প্রয়োজন, শিক্ষা হয়ে থাকবে।

এর আগের প্রশ্ন আমরা মাঠে কেনও গেলাম, ভেতরে প্রবেশের গেট কেন বন্ধ করা হল, তাদেরকে কেনও প্রবেশ করতে দেওয়া হলো না।

উত্তর ১- একক ভ্রান্ত ব্যক্তির যথেচ্ছ পরিচালনায় তাবলীগ নয়, কাজের পুরাতন সাথী (আলমী শূরা) এবং সহী নাহজে (পন্থায়) তাবলীগ চলবে, এটা সর্বজন স্বীকৃত বিষয়। এর বাইরে যারা নিজেদেরকে তাবলীগি বলে প্রচার করবে সেটা তাবলীগি নয় বরং বাতিল মত ও পথ।

উত্তর ২- তাই যতদিন না পর্যন্ত সত্যিকার অর্থে রুজু হয় এবং দারুল উলুম দেওবন্দের সমঝোতা হয় ততদিন পর্যন্ত তারা নিজেদের মত করে কোন আমল কিংবা অনুষ্ঠান করার প্রশাসনিক কিংবা তাবলীগের পক্ষ থেকে অনুমতি পাবে না।

উত্তর ৩- আমরা মাঠে গিয়েছি আমাদের আসন্ন ৫ দিনের জোড়ের প্রস্তুতির জন্য মাঠ তৈয়ারীর কাজে । পাশাপাশি ভ্রান্ত ফেরকা (প্রমাণিত) এতায়াতী ওরফে হাতাহাতি ভাইদের নিজেদের অনুমতিবিহীন জোড় যেন না করতে পারে সেটার নামমাত্র পাহারা (যেটা তাবলীগের চিরায়ত নিয়ম) দেওয়া।

তাবলীগওয়ালারা আপোষে মুহাব্বত করে, কেননা মুহাব্বাত দ্বীনের বড় খুঁটি। এর দ্বারা বড় অসাধ্য সাধন হয়। অনেক সময় এর দ্বারা বড়ও ক্ষতিও হয়ে যায়। এখন পর্যন্ত সত্যিকার অর্থে মূল ধারার তাবলীগের মধ্যে মুহাব্বাত করার ব্যাধিটা বহমান।

একটা ঘটনা ছোট্ট করে বলে নেই, আমরা ছিলাম মোটর সাইকেল টহল জামাতে। পুরো মাঠ চষে বেড়ানো ছিলো আমাদের দায়িত্ব। কোথায় কী হচ্ছে সেটা কেন্দ্রের মধ্যে জানানো সাথীদের মধ্যে একটা যোগসূত্র তৈরী করার দায়িত্ব ছিলো আমাদের। মোটর সাইকেল জামাতে এক ছেলেকে সন্দেহ হল। তাকে ধরে নিয়ে আসা হলো ডা. শাহাবুদ্দিন সাহেবের কাছে। আচরণ সন্দেহজনক হওয়ার পরও শাহাবুদ্দিন সাহেব বললেন- ওকে কিছু করো না, নজরে রাখো কিংবা আটকে রাখ। অথচ সেই শাহাবুদ্দিন সাহেবকে আমার দ্বীনি ভাইয়েরা রক্তাক্ত করতেও হাত কাঁপলো না। এটাই আমাদের দুর্বলতা, আমরা ভাই হয়ে ভাইয়ের গায়ে হাত তুলতে পারি না। আপনারা পারেন কেননা আপনারা তো আমাদের ভাই-ই মনে করতে পারে না।

বুধ থেকে শনি যা ঘটলো ।

বুধ থেকে শনি পর্যন্ত যা ঘটেছে মোটাদাগে তা উল্লেখ করব। আগপিছ হয়ে যেতে পারে, ধারাবাহিকতা নষ্ট হতে পারে তবে আশা করি বড় ধরনের বিচ্যুতি ঘটবে না, ইনশাআল্লাহ।

বুধ থেকেই সীমিত পরিসরে সাথীরা ময়দানে জমা হতে থাকে। আর উপস্থিত হওয়া সাথীদের সংখ্যা হিংস্রদের তুলনায় খুবই নগন্য। ওরা ছিলো রণে সুসজ্জিত। আমাদের এমনও হয়েছে ঘুম থেকে তুলে পিটিয়েছে, খাবার থেকে তুলে মেরেছে, নামাজ পড়া অবস্থায় মেরেছে, তাসবীহ জপা অবস্থায় মেরেছে, কুরআন পাঠরত অবস্থায় মেরেছে।

আমাদেরকে হেদায়াত দেওয়া হয়েছিলো- আমরা মারামারি করতে আসিনি। আমরা শুধুমাত্র পাহারার জন্য এসেছি। যদি মারামারি করতে আসতাম তাহলে সংখ্যাধিক্যতার একটা বিষয় ছিলো। উপরুন্তু গতকালের মধ্যে অধিকাংশ মাদ্রাসা ছাত্র চলে গিয়েছিলে। অনেক চাকুরিজীবি, নানা ধরনের পেশাজীবিরাও শুক্রবার রাতেই মাঠ থেকে চলে যায়। আমারও নিয়ত ছিলো রাতে চলে আসার কিন্তু আল্লাহ তায়ালা রেখে দিলেন। ভেবেছিলাম সকালে উঠে এসে অফিস করব। মোদ্দাকথা আমরা যদি মারামারি করতে চাইতাম তাহলে মারামারি করার জন্য পর্যাপ্ত জনবল যোগাড়ের দিকে মনোনিবেশ করতাম, তাদের মত বেডিং, সামানা ছাড়া আসতাম।

শুক্রবার রাতের মধ্যে অনেক মাদ্রাসা ছাত্র এবং পেশাজীবিরা চলে যাওয়ার ফলে ময়দানে সাথীর সংখ্যা কমে যায় এবং তা ধারণা করি সংখ্যাটা ৪-৫ হাজারের অধিক হবে না। রাতে খবর এসেছিলো এতায়াতীরা একত্রিত হচ্ছে। আমরা অনেকেই না ঘুমিয়ে সারারাত্র পাহারা দেই । ফলে শরীর ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলো।

ফজরের আযানের আগে কিছু সাথী তাহাজ্জুদ শেষ করে ফজরের জন্য ডাকাডাকি করছে। তখনই আওয়াজ আসলো ওরা এসে পড়েছে। সাথীরা হাতে বাঁশ নিয়ে গেটের দিকে এগিয়ে গেলো। স্তরে স্তরে নামায আদায় হলো। ততক্ষনে জমায়েত হওয়া এতায়াতি দায়ীরা বিভিন্ন পয়েন্টে একত্রিত হলো। কাঁধে বেডিং নাই, থাকার সামানা নাই, হাতে পানির বোতল, তবে লুকানো বাঁশ ছিলো। ৯৯৯ এ ফোন করে ময়দানের সম্যক অবস্থা অবহিত করলাম। ডিউটিরত অপারেশন চার্জ (ওসি) জানালেন ডিসিকে অবহিত করা হয়েছে এবং আমরা ফোর্স পাঠাচ্ছি। বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবনের জন্য দু’তিন জনকেও বললাম তারাও বলেছেন। ততক্ষন নাগাত আব্দুল্লাহপুরের আশেপাশে জমায়েত হওয়া হাজার বিশেক এতায়াতী বিভিন্ন পয়েন্টে একত্রিত হয়েছে । কিছু পয়েন্টে মাইক দিয়ে তাবলীগের পুরোনো সাথীদের বিরুদ্ধে বিষোদগার করে তুলছিলো। আলোচনায় সাহাবাদের জীবনের কুরবানিকে সামনে নিয়ে এতায়াতীদেরকে উগ্র করে তুলছিলো।

আমরা যেহেতু সংখ্যায় খুবই নগন্য ছিলাম আর আমরা নিজেদের মধ্যে মারামারিতে মোটেই প্রস্তুত ছিলাম না তাই হতবিহ্বল হয়ে পড়লাম। সারা রাতের নির্ঘুম রাত সকালের নাস্তার কোন ব্যবস্থা না হওয়ায় কিছু সাথী নাস্তার ফিকিরে যায় আর কিছু জরুরত পূরণে ব্যস্ত হয় (বাটা গেট)।

ওরা ছিলো সংঘবদ্ধ, একমুখী, একধ্যানে শুধুমাত্র অপেক্ষা করছিলো কখন ঝাপিয়ে পড়তে পারে। এর মধ্যে খবর আসলো কামাড়পাড়া ব্রিজের দিক থেকে ছাত্রদেরকে মারা হচ্ছে, তাবলীগি সাথীদের উপরে হাত তুলা হচ্ছে। আমাদের কিছু সাথী তখন সেদিকে রওনা হয় ফলে বাটা গেট ও অন্যান্য গেটের সাথী আরও কমে যায়।

ঘটনার সূত্রপাত ।

আমি যতদূর জেনেছি সেটা হলো পুলিশকে বসার জন্য চেয়ার দেওয়াতে বাহিরে থাকা শহীদি (?) তামান্না নিয়ে আসা এতায়াতী ভাইয়েরা ক্ষ্রিপ্ত হয়ে পরে মূর্হমুর্হ ইটবৃষ্টি নিক্ষেপ করে। গেট ধরে তীব্র ঈমানী জোশে জোশাক্রান্ত হয়ে নাড়াচাড়া করতে থাকে। গুটিকতক তাবলীগি সাথী এহেন আচরণে ভড়কে যায়। কেননা আমরা ধারণা করেছিলোম উপরের নির্দেশ অনুযায়ী তারা অবস্থান ধর্মঘট করবে বেলা বাড়ার সাথে সাথে জ্যাম বাড়বে। পুলিশ এসে তাদেরকে ‍উঠিয়ে দিবে। মাঝথেকে একটা শোডাউন হয়ে গেলো। ঠিক এরকম করেই অধিকাংশ তাবলীগি সাথী ভেবেছিলো।

গেট ভাঙ্গার ভিডিও এবং পরের ভিডিও আপনারা দেখেছেন। দেখেননি ভিতরের কাহিনী। কেননা ভিতরে আমাদের সাথীরা তখন সত্যিকার অর্থে কোণঠাসা অবস্থায় পৌছে গিয়েছিলো। পঙ্গপালের ন্যায় তড়িৎ পৌছে গেলো গোডাউনে। আমাদের এক সাথী যখন খবর পেলো যে ওরা প্রবেশ করেছে তখন সে নিজ থেকই বলল – ওযুটা করে নেই, বলা যায় না, মারা গেলে ওযু অবস্থাতেই মারা যাবো।

অবস্থা বেগতিক দেখলাম। মসজিদ আল্লাহর ঘর দ্বীনি ভাইয়েরা বলে থাকেন। আশ্রয় নিলাম মসজিদে। মসজিদে প্রবেশ করার পর দ্বীনি ভাইদের মুখের ভাষা একটু শুনেন।

Uncensored
মাগীর পুতেরা আমাগো মাঠ দখল করছে, বাইঞ্চোদের পুতেরা আমাগো পুলাপাইন দিয়া রাজনীতি, তোর মাগো…………..তোর…………..ইত্যাদি ইত্যাদি। মানসিকভাবে যেহেতু স্থিতি ছিলো না তখন সবগুলো মনযোগ দিয়ে শুনিনি। যখন দেখলাম মসজিদও তাদের কাছে কিছু না তখন বের হয়ে আসি।

ইতিমধ্যে পুরোদমে তাণ্ডব শুরু হয়ে যায় ভিতরে । নিজেদেরকে চেনার সুবিধার্থে ব্যাজ পড়া ছিলো। তাই সহজেই সনাক্ত করতে পেরেছে (ওদের একজনের স্বীকারোক্তি) তাই মাঠের মধ্যে থাকা সাথীদের চিহ্নিত করতে তাদের বেশি বেগ পোহাতে হয়নি।

আমরা নিজেদেরকে রক্ষা করার জন্য শুধুমাত্র লাঠি রেখেছিলাম, আর ওরা আমাদের হত্যা করার জন্য লাঠি নিয়েছিলো।

ভেতরে থাকা ইস্তেমায়ী সামানা, কাপড়-চোপড়, বাজার-সদাই নষ্ট করতে লাগলো।

মোটরসাইকেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। ভেঙ্গে চুরমার করে। কয়েকটি গাড়িকেও সর্বোচ্চ ক্ষতিসাধন করে।

আমরা তখন দিগবিদিক ঘোরাফেরা করছি। কোনদিকে যাব কোনদিকে কী করব তখন কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলাম না। এতটুকু আশা করেছিলাম আমাদেরকে সুন্দরভাবে মাঠ ছেড়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করবে।

সেটাও করলো না, ধাওয়া দিয়ে নদীর পাড়ে একত্রিত করলো। ময়লা পানিতে নামিয়ে বাধ্য করলো অধিকাংশকে। কিছু কিছু জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গেট দিয়ে বের হলো কয়েকদফা হামলার শিকার হয়ে। হায় এতায়াত !

কয়েক দফা মার খেয়ে সাথীরা যখন হাঁপিয়ে উঠেছে তখন পানিতে নামতে বাধ্য করা হয়, তাদেরকে বলা হয় অসুস্থ । প্রত্যুত্তরে বলে- নামবি নাকি মাইরা ফেলবি ? অগত্যা পানিতে নেমে যখন ভঙ্গুর হাতে পানিতে ডুবে যাওয়ার মত অবস্থা তখন অপর পাশ থেকে তাবলীগের ‘ত’ না জানা বেদ্বীন ভাইরা যদি বাঁশ এগিয়ে না দিত ‍তুরাগতীরেই হয়তবা কয়েকশ মানুষের সলিল সমাধি হত।

নদীর পাড়ে থাকা মানুষজন এসব চাক্ষুষ স্বাক্ষী- এহেন নজিরবিহীন কর্মকান্ডে তাদের মুখে কোন রা নেই। শুধু বলছে- ইজতেমার মাঠের হুজুররা আরেক হুজুররে এইভাবে মারতে পারে ?

নিহতের সংখ্য আমার জানা নেই, তবে অসংখ্য আহত চোখের সামনেই দেখেছি।

যখন ফিরে আসি তখনও এক ভাই, কান্না ভেজা কন্ঠে বলেন। মেহনত তো করতে পারি নাই কোনওসময়েই এই মারের কারণে যদি আল্লাহ মেহনতকে আবার ঠিক করে দেন। আবার আমার মিলেমিশে কাজ করতে পারি !

রিক্সায় বসে নিবিষ্টচিত্তে ভাবছি। আমার পুরো সত্তা যেখানে প্রতিশোধপরায়ন হয়ে আছে সেখানে কেমন করে আবার ঠিক হয়ে যাওয়ার সদিচছা করা যায় ?

যায়, নবীর কাজের প্রতি মোহাবিষ্টতা থাকলে, নবীদের কাজকে ভালোবাসলে শত বঞ্চনার পরও এমন মহানুভবতা থাকতে পারে।

Facebook Comments
15Shares

LEAVE A REPLY