ধর্ষণ মহামারি, কোটা সংস্কার ও অন্যান্য …..

লেমগণ বলেন যুলুম সংঘটিত হলে যালিমকে বাধা দেওয়াটাই তাৎক্ষণিক কর্তব্য। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে মাযলুমের দোষত্রুটি তালাশ করা তখন ঠিক নয়। ফিলিস্তিন থেকে বার্মা পর্যন্ত সবখানেই আমাদের মাযলুম ভাইবোনদের দ্বীনদারির ত্রুটি খুঁজে বের করা যাবে। সশস্ত্র প্রতিরোধে লিপ্ত জামাতগুলোর মধ্যে অনেক জায়গাতেই খারিজি আগাছা খুঁজে বের করা যাবে। কিন্তু আমরা কখনওই সামগ্রিকভাবে মাযলুমদের আর্তনাদকে ছাপিয়ে এই ত্রুটিগুলো নিয়ে আলোচনায় মেতে থাকি না।

ধর্ষণ যখন হয়েই যায়, তখন ধর্ষিতার (বা ধর্ষিতের) পোশাক নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করাটা যে ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে কতটা দায়িত্বজ্ঞানহীনতার পরিচয়, তা যদি আমরা বোঝাতে পারতাম! ক্ষুধার তাড়নায় আর কোনো বিকল্প না থাকলে যতটুকু শুকরের মাংস না খেলে মারা যেতে হবে, ততটুকু খাওয়া হালাল হয়ে যায়। তৃষ্ণার চোটে যতটুকু মদে চুমুক না দিলে মারা যেতে হবে, ততটুকু মদে চুমুক দেওয়া হালাল হয়ে যায়। কিন্তু যৌন ক্ষুধা-তৃষ্ণার তাড়নায় কখনও একটা দৃষ্টিও হালাল হয় না, ধর্ষণ তো অনেক পরে।

জেনে বা না জেনে কুফরি মতাদর্শকে ভালোবেসে ফেলা মানুষদেরও যদি আমরা বোঝাতে পারতাম যে, পোশাক নিয়ে আলোচনা করাকে গায়ের জোরে ‘ধর্ষণ জায়েজ করতে চাওয়া’ বলে ঘোষণা করাটাও কতটা বুদ্ধিহীনতার পরিচয়! নির্দিষ্ট রকমের পোশাক পরাটা আমাদের উপর আল্লাহর পক্ষ থেকে অর্পিত দায়িত্ব। ধর্ষণ হওয়ার সম্ভাবনা আছে কি নেই – তার ভিত্তিতে পোশাক সংক্রান্ত এই ফরযিয়াত রহিত হয়ে যায় না।

নারী-পুরুষের মিথষ্ক্রিয়া নিয়ে ইসলামের যে বিধান, পোশাকের আকৃতি-প্রকৃতি তার একটা অংশ মাত্র। প্রতিটি ব্যক্তি মানুষের অভ্যন্তরীণ নৈতিকতা সংশোধন থেকে শুরু করে কার্যকর বিচারিক ব্যবস্থা স্থাপন পর্যন্ত অনেক বিষয় এই বিশাল সিস্টেমের অন্তর্গত। সেখান থেকে একটা উপাদান (যেমন বোরকা) আলাদা করে এনে সেটা নিয়েই আলোচনা করলে বিতর্কের কোনো পক্ষই আসলে নিজের বক্তব্য প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে না।

মানুষ মাত্রই গুনাহের প্রতি আকর্ষণবোধকারী (কেবলমাত্র নবী-রাসূলগণকে আল্লাহ দয়া করে এ থেকে হিফাজত করে রাখেন)। এটি অস্বীকার করার কিছুই নেই। ফেরেশতাদের সাথে এখানেই মানুষ ও জিন জাতির পার্থক্য। আর এই পার্থক্যের কারণেই রয়েছে জান্নাত ও জাহান্নাম। মুসলিমরা কখনওই দাবি করে না যে, ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেলে মানুষের এই আকর্ষণ মরে যাবে। দরজা আটকে সবার অগোচরে কেউ যিনা করলে খলিফার এখানে কিছু করার নেই। কিছু ব্যাপারে মানুষের কিছু করার থাকে না। এই সীমাবদ্ধতা দিয়েই মানুষ, জিন ও দুনিয়াকে সৃষ্টি করা হয়েছে।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবদ্দশায়, যখন ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত আছে, পর্দার আয়াত নাযিল হোক বা না হোক, মানুষ ইসলামী নৈতিকতা মেনে চলে, এমন সময়েও মানুষ এসে ব্যভিচারের দোষ স্বীকার করে নিজের শাস্তি দাবি করেছেন। এমন ঘটনা হাদীসে একাধিক। রজম করে তাঁদের হত্যা করা হয়েছে। এখানে রাষ্ট্রপ্রধান বা নবী হিসেবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কোনো দোষ নেই। ধর্ম বা সংবিধান হিসেবে ইসলামেরও কোনো দোষ নেই।

উল্লেখ্য, যিনা বা অন্য কোনো কবীরা গুনাহের কারণে কেউ কাফির হয় না। আর যেসব মুসলিম জীবদ্দশায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দেখেছেন, তাঁদের বলা হয় সাহাবা। কাজেই মাদ্রাসার হুজুরের ছাত্র ধর্ষণের কথা বলে মুসলিমদের ভড়কে দেওয়া সম্ভব না। মানুষ গুনাহ করলে শাস্তি পাবে, দুনিয়ায় বা আখিরাতে। As simple as that.

আবার ইসলামে সমকামিতা ও অজাচার হারাম। হারাম বলে ঘোষণা করার অর্থই হলো ইসলাম এগুলোর অস্তিত্ব স্বীকার করে। কিন্তু তাই বলে পুরুষে-পুরুষে বা পিতা-কন্যার মাঝে ইসলাম পর্দার সেইরকম কঠোর বিধান রাখেনি, যেরকম কঠোর বিধান রয়েছে গায়রে মাহরাম নারী-পুরুষের মধ্যে। তাই বলে কি সমকামিতা বা অজাচার ঘটে না? এখানেও বিধান হিসেবে ইসলামের দোষ নেই। ওই ব্যক্তিরই দোষ, যে সমকামিতা বা অজাচারের অভ্যাস গড়ে তুলেছে।

মোট কথা, এত বিশাল বিস্তৃত একটা সিস্টেমের সব দিক নিয়ে কেবল বিতর্ক করেই সব মানুষকে কনভিন্স করা কখনোই সম্ভব না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ও সাহাবাদের পদ্ধতি তাই ছিলো বিতর্ক কম করে কাজের কাজ করা। ইসলামকে যখন একটি সামগ্রিক সিস্টেম হিসেবে সমাজ-রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠিত করে ফেলা হয়, তখন বিরুদ্ধবাদী তার্কিকরা দুর্বল হয়ে পড়ে। নরওয়ের সংবিধানে মৃত্যুদণ্ড নেই। বাংলাদেশের সংবিধানে কেন এমন ‘বর্বর’ আইন আছে, এ নিয়ে কেউ বিতর্ক করে না। কারণ প্রতিষ্ঠিত আইনকেই বেশিরভাগ মানুষ স্বাভাবিক ও গ্রহণযোগ্য বলে মেনে নেয়।

এই বিশাল দায়িত্ব বাস্তবায়নের লক্ষ্যে জনসমর্থন আদায়ের জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যেই পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন, তা তাঁর নবী হওয়ার সুস্পষ্ট প্রমাণ। বিশুদ্ধ ইসলামী আকিদার দিকে না ডেকে তিনি মক্কার গরীব মিসকীনদের উত্তেজিত করে আবু জাহলদের এলিট শ্রেণীর বিরুদ্ধে অনেক জনসমর্থন আদায় করে ফেলতে পারতেন। কিন্তু তিনি এ পথে হাঁটেননি। পেটের দায়ে ঠেকায় পড়ে আন্দোলন করলে সে আন্দোলন দুনিয়া ও আখিরাতে তেমন কোনো কল্যাণ আসে না।

পেটে টান পড়েছিলো বলেই অনেকে রাজপথে নেমে এসে ভ্যাটের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছে। ভ্যাট মওকুফ করে পেট ঠাণ্ডা করে দেওয়া হয়েছে, আন্দোলন শেষ। পেট চলছে না বলে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন হচ্ছে। কোটা কমিয়ে পেট ঠাণ্ডা করার ব্যবস্থা করে দিলে সে আন্দোলনও শেষ। পেটের টান আছে বলে অধিকাংশ জনগণ এ আন্দোলনের যৌক্তিকতা দেখতে পাচ্ছে। কিন্তু পেটের টান ছিলো না বলে এসকল মানুষেরই বড় একটা অংশ হেফাজতি হুজুরদের লাশের সংখ্যা নিয়ে ট্রলাট্রলিতে মেতে উঠেছিলো। ভুলিনি রে, ভাই! কিছুই ভুলিনি।

কিন্তু ভ্যাট বা কোটার কারণে এসকল মানুষের পেটে যে টান পড়লো, সেটা কি তাদের উপর যুলুম নয়? মাযলুম হিসেবে কাঁধে হাত পাওয়াটা কি তাদের ইসলামি অধিকার নয়? কেউ সেটা অস্বীকার করছে না। কিন্তু কোনো আদর্শগত অবস্থান ছাড়া, শুধুমাত্র ক্ষুধা মেটানোর জন্য আন্দোলন করাটা ইসলামি শিক্ষা না। শুয়াইব আলাইহিসসালাম অবশ্যই তাঁর জাতির মার্কেট জালিয়াতির যুলুমের বিরুদ্ধে দাওয়াত দিয়েছিলেন। কিন্তু তাওহীদের দাওয়াত দিয়েছিলেন তার চেয়েও বেশি গুরুত্ব সহকারে। লূত আলাইহিসসালাম গে রাইটসের বিরুদ্ধে দাওয়াত দিয়েছিলেন। কিন্তু তাওহীদের দাওয়াত দিয়েছিলেন তার চেয়েও বেশি গুরুত্ব সহকারে। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ফিমেইল চাইল্ড কিলিং এর বিরুদ্ধে দাওয়াত দিয়েছিলেন, অরফান রাইটস লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে দাওয়াত দিয়েছিলেন। কিন্তু তাওহীদের দাওয়াত দিয়েছিলেন তার চেয়েও বেশি গুরুত্ব সহকারে। কারণ আল্লাহকে বিধানদাতা হিসেবে মানাটা সকল সমস্যার চূড়ান্ত সমাধান।

খুচরো ইশ্যু ধরে ধরে আন্দোলন করে মানুষের সহমর্মিতা আদায় করাটা গণতান্ত্রিক বিরোধী দল বা বামপন্থীদের কার্যপদ্ধতি। এজন্যই দেখা যায় দুর্নীতিতে দেশকে পাঁচবার চ্যাম্পিয়ন করা দলটাও কোটা সংস্কারের পক্ষে। সোভিয়েত রাশিয়ায় রক্তের সাগরে মুসলিমদেরকে ডুবিয়ে দেওয়া লোকদের ভাবশিষ্যরাই এখানে প্রতিটা ইশ্যুতে সবার আগে এসে মাযলুমের পাশে দাঁড়ায়। কারণ তারা তাদের ক্ষীণ দুনিয়াবি দৃষ্টিভঙ্গির কারণে শক্ত আদর্শিক অবস্থান তৈরি করা ছাড়া কেবল জনসমর্থন আদায় করাটাকে ক্ষমতায় যাওয়ার কার্যকর সিঁড়ি বলে মানে। সেখানে আল্লাহ তাঁর সর্বব্যাপী দৃষ্টি থেকে ইসলামের অনুসারীদের এমন পথ অবলম্বন করার হুকুম দেন, যা আমাদের সংকীর্ণ দৃষ্টিতে না ধরলেও বাস্তব জীবনে অবিশ্বাস্যরকম কার্যকর।

লাশ নিয়ে ট্রল করা জনগোষ্ঠীর সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ থেকে আরও কিছু শেখার আছে। ভিসির বাসভবন ভাংচুর আর মেঝেতে পড়ে থাকা বঙ্গবন্ধুর ছবি অনলাইনে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ‘মুখোশধারী’ কোনো একটা গ্রুপ এ কাজ করে এসেছে। আচ্ছা, ব্যানারে বঙ্গবন্ধু আর প্রধানমন্ত্রীর ছবি লাগানো এক দল আন্দোলনকারী এ কাজ কেন করবে? ‘বঙ্গবন্ধুর বাংলায় বৈষম্যের ঠাঁই নাই’ স্লোগান দেওয়া আন্দোলনকারীরা কেন এ কাজ করবে? মনে আছে হেফাজতে ইসলাম যে ‘কুরআন পুড়িয়েছিলো’? কুরআনের প্রতি হুজুরদের এই অবমাননা দেখে যে আপনার শক্ত ঈমানওয়ালা বেনামাজি মনটা কেমন হাহাকার করে উঠেছিলো? এখানেও একই ঘটনা। ইশারাই যথেষ্ট।

14Shares

Check Also

islamic news

“ভারতের সংখ্যালঘু মুসলমানদের বিভিন্ন অজুহাতে হত্যা নির্যাতন ও হয়রানি বন্ধে করণীয়” শীর্ষক গোলটেবিল হয়েছে জাতীয় প্রেসক্লাব মিলনায়তনে।

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় কমিটির আয়োজনে বৈঠকে সভাপতিত্ব করছেন সংগঠনের সিনিয়র নায়েবে আমীর মুফতী সৈয়দ …

A 5G-Enabled Foldable iPad

৫ জি আইপ্যাড আসছে। 5G-Enabled Foldable iPad

অ্যাপেল এমন একটি প্যাড নিয়ে আসছে যেটা ৫জি নেটওয়ার্ক সাপর্ট করবে । অ্যাপেলের এই নোটকে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *