আরিফ আজাদের সম্পাদনায় মা মা মা এবং বাবা

Somokalin Prokashon এর প্রকাশক একদিন আমাকে বললেন যে তাদের একটা বই সম্পাদনা করে দেওয়া লাগবে। বই সম্পাদনার কাজ যে কতো প্যারাময় কাজ সেটা আমি তখন কিছুটা হলেও বুঝতে শিখেছি। কিন্তু, আমি যে তাদের মুখের উপর ‘না’ বলে দেবো, সে উপায় নেই। কারণ, এই বইটার পেছনে একটি স্মৃতি জড়িয়ে আছে। বেদনাবিধূর স্মৃতি। এই বইটি প্রকাশ হওয়ার কথা ছিলো দেশের প্রথিতযশা প্রকাশনী ‘সরোবর প্রকাশন’ থেকে।

বইয়ের প্রাথমিক খসড়া দাঁড় করিয়েছিলেন ‘বাক্সের বাইরে’ এবং ‘তত্ত্ব ছেড়ে জীবনে’র মতো দূর্দান্ত বইয়ের লেখক Sharif Abu Hayat Opu ভাই, যিনি আবার ‘পড়ো’ বইয়ের মতো পাঠকনন্দিত বইয়েরও সম্পাদক। অপু ভাইয়ের সাথে সহযোগি হিশেবে ছিলেন আমাদের সময়কার অন্যতম সুলেখক (কোন বই না লিখেও যাকে সুলেখক হিশেবে ধরা যায়, আমার মতে) Armaan Ibn Solaiman ভাই। সে যাহোক, এরপর একদিন হঠাৎ করে বন্ধ হয়ে গেলো ‘সরোবর প্রকাশন’। মার্কেটে আসা বন্ধ হয়ে গেলো ‘পড়ো’, ‘ফেরা’ এবং ‘বাক্সের বাইরে’।

একদিন জানতে পারলাম ‘পড়ো’, ‘ফেরা’ নতুন করে বাজারে আসছে। কে আনছে? ‘সমকালীন প্রকাশন’। যাক, আলহামদুলিল্লাহ। বইগুলো নতুন করে বাজারে আসছে দেখে আমি আপ্লুত।

যে বইটার কথা বলছি, সেই বইটার স্বপ্ন দেখেছিলো সরোবর পরিবার। এই বইটার স্বপ্নদ্রষ্টা শরীফ আবু হায়াৎ অপু ভাই। তখন ‘সরোবর’ এবং ‘অপু ভাই’ আমাদের জীবনের দু’টো গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। এই লোকটাকে দেখতে দেখতেই তো আমরা দ্বীনে এসেছি।

দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিলাম। ‘মা, মা, মা এবং বাবা’ আমিই সম্পাদনা করবো। এখনো মনে আছে আমার, এক সন্ধেবেলা অপু ভাইয়ের বাসায় অপু ভাইয়ের সাথে আলাপ করছিলাম। তিনি বললেন, ‘আরিফ, তোমার প্যারাডক্সিক্যাল সাজিদ কতো মানুষের কাছে পৌঁছেছে? মানে, কতো কপি সেল হয়েছে?’
আমি মিনমিন করে বললাম, ‘হবে হয়তো পঞ্চাশ হাজারের মতো’।
ভাইয়া তখন আমার দিকে সুদৃঢ় এক চাহনি দিয়ে বললেন, ‘তোমার বইটা যদি পঞ্চাশ হাজার সেল হয়, এই বইটা (মা, মা, মা এবং বাবা) সেল হবে এক লাখ কপি। এটা সেরকম একটা বই’।

ভাইয়া আরো বললেন, ‘এই বইটা পড়ে কান্না করবেনা, আবেগাপ্লুত হবেনা এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হবে। আমি যখন এই বইটা নিয়ে কাজ করি, একবার এতোই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছিলাম যে, আমি অফিস থেকে এসে গরম পানি করে আমার আম্মার পা ধুইয়ে দিয়েছিলাম। আমার আম্মা কতোজনের কাছেই যে সে গল্প করেছে। বলতো- আমার অপু আমার পা ধুইয়ে দেয়। এই বইটা সেরকম একটা বই। এটা যে পড়বে, তার বাবা-মা যদি বেঁচে থাকে, সে বাবা-মা’র প্রতি এমন অনুগত হয়ে যাবে যে, যা সে কোনোদিন কল্পনাও করেনি। আর, যাদের বাবা-মা বেঁচে নেই, তারা তাদের বাবা-মা’র জন্য সালাতে দাঁড়িয়ে হুঁহুঁ করে কান্না করবে’।

আমি ভাইয়ার কথাগুলো খুব মনোযোগ দিয়ে শুনছিলাম। এতোটা আত্মবিশ্বাস নিয়ে যখন অপু ভাই কথা বলেন, তখন সেটা অবশ্যই অবশ্যই ভিন্নরকম কিছু। ‘মা, মা, মা এবং বাবা’ বইটা সম্পাদনার আগ্রহ আমার তখন আরো কয়েকগুণ বেড়ে গেলো।

এরপরের মাসের কথা। সবে বইটার ফাইল নিয়ে বসলাম। গল্পগুলোর সম্পাদনা করতে গিয়ে এমন হচ্ছিলো যে, আমার চোখের পানিতে ল্যাপটপের কী-বোর্ড ভিজে যাচ্ছে। চোখটা বারবার ঝাপসা হয়ে উঠছে। আমার তখন মনে হচ্ছিলো, আমি এক্ষুণি উড়াল দিয়ে আমার মা’র কাছে চলে যাই। গিয়ে তাঁর পা ধরে বসে থাকি। এ যাবৎকালের সমস্ত অন্যায়, অবিচার আর অবাধ্যতার জন্য মাফ চাই… আমার মন চাচ্ছিলো আমি শিশুদের মতো ‘মা মা’ বলে হাউমাউ করে কান্না করি…
বাবার বুকে মাথা গুঁজে বলি, ‘বাবা! আমাকে তুমি মাফ করে দিও। কতোইনা অবাধ্য ছেলে আমি তোমার…’।

এরপরের দিন অফিসে জানিয়ে দিলাম যে আমার এক সপ্তাহ ছুটি দরকার। আমি বাড়ি যাবো। আমার ছুটি মঞ্জুর হলো। আমি ঠিক এর পরেরদিনই চট্টগ্রামে চলে গেলাম। সারাটা পথ আমার মন বিষণ্ণ ছিলো। একটা বই একটা মানুষের মনকে এতোটা নাড়া দিয়ে যেতে পারে, আমি ভাবতেই পারছিলাম না। সেদিন সন্ধ্যেবেলার অপু ভাইয়ের বলা কথাগুলোও মনে পড়ছিলো বারবার…

কথা ছিলো বইটা ‘বইমেলা ২০১৮’ তে প্রকাশ হবে। সেরকম প্রস্তুতিও ছিলো প্রকাশনীর। আমি আমার পক্ষ থেকে সম্পাদিত কপি জমা দিয়ে দিলাম। কিন্তু বেঁকে বসলেন অপু ভাই। বললেন, ‘খবরদার! কাঁচা কাজ যেন নাহয়। এটা কিন্তু এমন একটা বই যা মানুষকে কাঁদাবে, ভাবাবে। এটা পড়ে মানুষ একজন অন্যজনকে রেফার করবে। কাঁচা কাজ হলে কিন্তু কোনোভাবেই চলবেনা। বইমেলাতেই আনতে হবে এমন কোন কথা নেই। তাড়াহুড়োর দরকার নেই। তাড়াহুড়ো করে শয়তান। আস্তে আস্তে কাজ করো। বেস্ট একটা কাজ হওয়া চাই’।

অপু ভাইয়ের কথা শুনে ‘সমকালীন প্রকাশন’ শিডিউল পিছিয়ে দিলো। বইমেলায় আসার কথা থাকলেও বইটা মেলায় আর আসেনি…

আমি বইটা নিয়ে আবার বসলাম। আবার পড়তে গিয়ে দেখলাম কাজটা আসলেই কাঁচা রয়ে গেছে। সম্পাদনার এই এক প্যারা। যতোবার পড়া হবে, মনে হবে- ‘আরে, আরো কাজ করা লাগবে। এটা এভাবে না হয়ে, ওভাবে করলে ভালো হতো…’। ব্যস, বইটা নিয়ে আবারও কাজে লেগে গেলাম। এরপর কেটে গেলো মার্চ, এপ্রিল, মে, জুন, জুলাই, আগস্ট। ছয় ছটা মাস। দীর্ঘ পরিশ্রম, সমকালীনের সম্পাদক প্যানেলের আপ্রাণ প্রচেষ্টা আর যত্নে অবশেষে বইটা মনের মতো হয়ে উঠলো। কিন্তু, কাভার…?

মধুর এই বিড়ম্বনার সেখানেই শেষ ছিলোনা। এরপর এই বইয়ের কাভার নিয়েও কতো কাহিনী হলো। যেহেতু আমি সম্পাদনা করেছি, তাই কাভারের আইডিয়া দেওয়ার দায়িত্ব পড়লো আমার উপর। আমি আইডিয়া দিলাম। কাভার হলো। সেই কাভার আমি আবার অপু ভাইকে দেখালাম। অপু ভাই বললো- চলবে না।
আবার করা হলো। আমার পছন্দ হলো। অপু ভাইকে দেখালাম। ভাই বললো- চলবে না।
তখন আসলে কি যে চলবে সেটাই আর বুঝে উঠতে পারছিলাম না। আমি হাল ছেড়ে দিলাম। এবার দায়িত্ব অপু ভাইয়ের। তিনি নিজে সমকালীনের ক্রিয়েটীভ টীমকে কাভারের আইডিয়া বুঝিয়ে দিলেন। এরপর, অনেক জল্পনা-কল্পনার শেষে, অনেক কাঠখড় পুঁড়িয়ে কাভারটা হলো, আলহামদুলিল্লাহ।
এবং আরো ভালো লাগছে এই ভেবে যে, ফাইনালি এই মাসেই বইটা পাঠকের হাতে উঠতে যাচ্ছে, ইন শা আল্লাহ।

জীবনে আমি হয়তো আরো অনেক বই সম্পাদনা করবো, ইন শা আল্লাহ। আরো ভালো ভালো কন্টেন্ট, ভালো ভালো বই হয়তো পড়ে দেখার, কাজ করে দেওয়ার সুযোগ আল্লাহ চান তো হবে আমার। কিন্তু, আর কোন বই পড়ে কি আমার ল্যাপটপের কী-বোর্ড ভিজবে? চোখ বারবার ঝাপসা হয়ে উঠবে? আর কোন বই নিয়ে কি আমি এরকম স্মৃতিকাতুরে হয়ে পড়বো? আমি জানিনা…

‘একটি বই… এক চিলতে স্বপ্ন এবং এক টুকরো স্মৃতি’/ আরিফ আজাদ

6Shares

Check Also

২৬ শে মার্চ মহান স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে ইশা ছাত্র আন্দোলন ভোলা জেলা উত্তরের দোয়া মাহফিল ও বর্ণাঢ্য ‌র‌্যালী অনুষ্ঠিত ।

 মিজানুর রহমান ভোলা জেলা সংবাদদাতাঃ ২৬ শে মার্চ মহান স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে শহিদদের স্বরণে ইসলামী …

islamic news

ইশা ছাত্র আন্দোলন ভোলা জেলা উত্তরের ২০১৯ সেশনের পূর্ণাঙ্গ কমিটির শপথ গ্রহন ও পরিচিতি সভা অনুষ্ঠিত ।

মিজানুর রহমান, ভোলা জেলা সংবাদদাতাঃ bangla news শুক্রবার (৮ মার্চ) ইসলামী শাসনতন্ত্র ছাত্র আন্দোলন ভোলা …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *