SAROR MAYAR KHELA

সাগর মায়ার খেলা – রাশিদুল ইসলাম স্বপ্ন

একজন মেরিনার এর জীবনে কি হয় কি ঘটে তা জানতে অবশ্যই এই লেখাটা পড়বেন । 

জাহাজে_জাওয়ার_আগেঃ
কবে যাব জাহাজে? আর তর সইছে না, এমন একটা অবস্থা যেন জাহাজে যেতে পারলেই আমার জীবনের সব পাওয়া হয়ে যাবে। কি নেই সেখানে?? সব আছে সব পাবো।

না জানি কত বড় জাহাজ, কত্ত জল্পনাকল্পনা জাহাজ নিয়ে, হঠাৎ জাহাজে জাওয়ার ডাক পেয়ে বুঝতে পারছিলাম না আমি খুশি না কি মন খারাপ, কেনই বা এই দোটানা হচ্ছে সেটাও বুঝতে পারছিলাম না।

১ম_জাহাজে_জাওয়াঃ
আমাকে জানানো হয়েছিল চট্টগ্রাম এসে সিলেকশন ও সাইন অন করে পর দিন মেডিকেল করে সেদিনই জাহাজে যেতে হবে, তাই সব গুছিয়ে নিচ্ছিলাম, এর মাঝে আবার ফোন এলো ৫ দিন আগেই জেতে হবে তার মানে যেদিন কল আসলো তার ২ দিন পরেই চট্টগ্রাম জেতে হবে।

তখন থেকেই শুরু হল আমার মা এর কান্না, খেতে বসে কান্না, রান্না করতে যেয়ে কান্না, ঘুমাতে যেয়ে কান্না। তার কারন হয়তো স্বাভাবিক কিন্তু আরো কারন হলো আমি ম্যাক্সিমাম সময় বাসায় আমার মা ও আপুর সাথেই থাকতাম, খুব একটা বাইরে আড্ডা দেওয়ার অভ্যাস নেই তাই স্কুল কলেজ ও মসজিদ বাদে খুব দরকার ছাড়া বাইরে যাওয়া হয়না,

আমার ফ্রেন্ডস বলতে মা ও আপু, বাইরে আড্ডা ও সময় দিতে পারিনা বলে খুব একটা ফ্রেন্ড ছিল না, আর মা ভক্ত ছেলে আমি, সব সময় মা এর পাশে না থাকলে ভাল লাগেনি তাই হঠাৎ এত দূরে চলে যাচ্ছি ভেবে মা কষ্ট পাচ্ছিল, যেখানে আমাকে কোথাও যেয়ে একরাত থাকতে দেয়না মা এর ঘুম হয়না আমি বাড়ি না থাকলে সেখানে ৮/৯ মাস কি করে থাকবে।

যাই হোক ডলারের টানে ঘর ছারতেই হয়েছিল। যেদিন আমি চলে আসি আমার এলাকার অনেক মানুষ জমা হয়েছিল বাসায়, বিয়েতেও বিনা দাওয়াতে এত মানুষ আসে না।

সবাই খুব চুপচাপ ছিল,যেন গভীর শোক চলছে, শুধু আম্মু আপু আর দাদী কাঁদছিল বাকি কারো কারো চোখে পানি আসলেও সেটা লুকাতে সক্ষম ছিল, কিন্তু আপু দাদী আর মা তো মা ই….।

জাহাজে_১ম_দিনঃ
আমার ১ম জাহাজ MV. MARSI আবুল খয়ের কম্পানির ছিল। কম্পানির লোক কারে করে নিয়ে গিয়েছিল চট্টগ্রাম পোর্ট এ। যখন দেখলাম আমাদের জাহাজ পোর্টে বাঁধা, দেখে চোখ ধাঁদিয়ে গিয়েছিল, এত্ত বড় জাহাজ আমি আগে ভাবিনি।

জাহাজে লোহার বার এসেছে ইউক্রেন থেকে, আমি আমার এক ব্যাচ মেট এর রিলিভার (যার পরিবর্তে আমি জয়েন করলাম)। সে আমাকে মোটামোটি কেবিন(থাকার রুম) থেকে ম্যাচরুম (ডাইনিং রুম) সব বুঝিয়ে দিয়ে গেল।

তার পরই ফাইলপত্র নিয়ে ক্যাপ্টেন স্যারের কাছে গেলাম শুরু হয়ে গেল আমার সামুদ্রিক জীবন।

১ম_ক্যাপ্টেনঃ
১ম ক্যাপ্টেন ছিলেন হুমায়ূন কবির স্যার, যেমন রাগী তেমনি ভাল। ঝারিও খেয়েছি আবার ভালবাসাও পেয়েছি, স্যার ছিলেন নামাজের দিকে কেয়ারফুল, কে নামাজে আসলো না কেন আসলো না সেটা জবাব দিহি করে ছারতেন।

১ম_শিপমেটঃ
সত্যি বলতে ১ম শিপে যাদের পেয়েছিলাম তাদের খুব বেশি মিস করি প্রতিবার শিপে গেলেই। বিশেষ করে ইব্রাহিম ভাই, মোজাম্মেল ভাই, Mahfi ভাই, Omi ভাই, মামুন ভাই, গিয়াস ভাই আমার জুনিয়র তারেক,

পাভেল এদের তো এ জীবনে ভোলা হবে না, সত্যিই অসাধারন ভাল লাগার কিছু সৃতি রয়ে গেছে এদের সাথে, সেই দিন ক্ষন সময় আর আসবে না কখনো, যে যেখানেই থাক আল্লাহ যেন ভাল রাখেন সবাই কে।

১ম_সেইলিংঃ সেইল বা সেইলিং হল কোন দেশ থেকে অন্য দেশের উদ্দেশ্যে ছেরে জাওয়া। যাই হোক, সেইলিং এর সবয় থেকে শুরু হল আমার ভয় ও বাড়ির সবার জন্য খারাপ লাগা।

এত্ত বড় শিপ যে পানিতে এত দুলবে কে জানতো, দোলা তো নয় মনে হয় কাত হয়ে এখনি ডুবে যাচ্ছে,কিন্তু ডুবতে ডুবতে ফিরে এসে আবার অন্য দিকে কাত, এমন রোলিং খাইলাম বঙ্গোপসাগর সাগরে যে দিনে ২/৩ বারের উপরে বমি করে মরার মত অবস্থা, তার পর আন্দামান সাগর তো আছেই।

রাতে ঘুম আসতো না, মনে হতো ঘুমাবো আর যদি জাহাজ ডুবে যায় তাহলে কি হবে, লাইফ জ্যাকেটের দিকে তাকিয়ে সুয়ে থাকতাম, মনে হতো এই বুঝি জাহাজ ডুবলো।

তখন মা কে আপু কে আমার শুভ ও টমি কে ভেবে খুব খারাপ লাগতো, আর বুঝি ওদের সাথে দেখা হবে না, ওরা আমাকে ভেবে কষ্ট পাচ্ছে এগুলা ভেবেই দিন যাচ্ছিলো।

১ম_এরাইভালঃ ১ম এরাইভাল (কোন দেশে যেয়ে পৌছা) ছিল থাইল্যান্ড এর কোসিচাং আউটার এংকরেজ। জাহাজ পৌছা মাত্রই ২৫/৩০ জন মহিলা পুরুষ জাহাজে চলে আসলো কার্গো লোডিং এর কাজ করার জন্য, এর মাঝে সিম কার্ড ও কিনে ফেলেছি, ১২ দিন পর বাসায় কথা বলতে পেরে মোটামোটি ভালই লাগছিলো…।।

১ম_ওয়েজেজ_বিলঃ ১ম মাসের সেলারি সিট ছিল ৩৮১ ডলার। তখন তো আমি ১ম শিপে ট্রেনি হিসাবে ছিলাম, তাই ৩৮১ ডলার মানে (৩২,১৬০/= টাকা) আমার কাছে ছিল ওটাই অনেক টাকা।

কিন্তু ক্যাডেট মাহফি ভাই এসে সাইন করিয়ে নিয়ে গেল কিন্তু ডলার কই? চিন্তায় পরে গেলাম সবাই হয়তো ডলার পেয়েই সাইন করেছে আমি তো পাইনি কিন্তু সাইন তো দিয়ে দিলাম এখন কি হবে,

পরে রাতে ক্যাপ্টেন স্যার সবাই কে ডেকে সেলারী দিয়ে দিলেন, আমার খুশি দেখে কে, কত্ত প্ল্যান ছিল এই টাকা দিয়ে কি কি হবে… ভাবলে হাসিও পায় আবার ভালও লাগে।

১ম_বোকা_হওয়াঃ
আমার তখন জাহাজে ২ মাস পার হইছে অলরেডী, ভিয়েত নাম যাচ্ছিলাম সিংগাপুর স্টেটে আছি, হঠাৎ চিফ অফিসার আমাকে ডেক অফিসে ডেকে নিয়ে ধমক দিয়ে জানতে চাইলো আমি গত ২ মাস ধরে জাহাজে আছি কিন্তু এখনো পানির বিল, ইলেক্ট্রিসিটি বিল, খাওয়ার বিল, রুম ভারা কিছুই দেইনি কেন?

এখন স্যার হিসাব মিলাতে পারছে না আমার এই সব বকেয়া বিলের জন্য।

আমি তো পুরো ভ্যাবাচ্যাকা অবস্থা, আসলেই তো AC তে থাকা, এত্ত ভাল ভাল এভইলেবল খাওয়া,২৪ ঘন্টা ইলেক্ট্রিসিটি এগুলা কি ফ্রী পাওয়া যায় নাকি।

Sorry বলে স্যার কে জানতে চাইলাম সব মিলিয়ে কত ডলার এসেছে। স্যার বল্লো ২ মাসে মোট বিল হইছে ৩০০ ডলার কিন্তু বিলম্ব সহ ৩৫০ ডলার।

মাথায় বাজ পরলেও কিছুই করার নেই যা দেওয়ার তা তো দিতেই হবে, জানতে চাইলাম এখনি বিল দিয়ে দিব কিনা, স্যার বল্লো ডিনার পর যেন ক্যাপ্টেন স্যারের অফিসে বিল নিয়ে আসি।

আমি ডিউটি চলে গেলাম, কাজে মন নেই শুধু চিন্তা হচ্ছে আগে থেকে কেও বললে তাও বিলম্ব মাশুল ৫০ ডলার বেশি দেওয়া লাগতো না। এখন থেকে সেলারী পেয়েই বিল দিয়ে দিব।

ডিনার পর বিল নিয়ে ভয়ে ভয়ে ক্যাপ্টেন অফিস যেলাম, গলা শুকিয়ে যাচ্ছে ক্যাপ্টেন স্যার না জানি কি বলবে।

আমি যেয়ে দেখি ২ ক্যাডেট, চিফ ইঞ্জিনিয়ার স্যার, চিফ অফিসার ও ক্যাপ্টেন স্যার কথা বলছে। আমাকে দেখেই সবাই এক সাথে জোরে হেসে দিল।

আমি তো ভাবলাম এত দিন এগুলা জানিনা বিল দেইনি তাই হাসছে। ক্যাপ্টেন স্যার জানতে চাইলো বিল এনেছি কিনা?

আর এত দিন দেইনি কেন? শুধু আসতে করে বললাম আগে জানতাম না স্যার। স্যার হেসে বল্লো যাও তোমার বিল লাগবে না।

পরে জানতে পারলাম এগুলা সবই ফ্রী আর জাহাজে আমাদের কোন খরচ নেই। হুদাই এমন বোকা বানালো চিফ স্যার।

১ম_ন্যাড়া_হওয়াঃ
মেরিনে একটা ভিত্তিহিন রেওয়াজ চালু আছে, ১ম ইকুয়েটর ক্রস করলে জুনিয়র দের মাথা ন্যাড়া করে অনুষ্ঠান করা। ইন্দোনেশিয়া যাওয়ার সময় আমাদের জাহাজ ইকুয়েটর ক্রস করায় ন্যাড়া করে দিয়েছিল আমাকে, আমার দলে লোক ছিল মোট ১৩ জন।

১৩ জনের হাত বেঁধে আসামীর মত করে এক সাথে বসিয়ে পার্টির আয়োজন করে, পাগলা ড্যান্স, নাচ গান খাওয়া দাওয়া মজা মাস্তির মাধ্যেমেই ন্যাড়া করা হয়েছিল।

শিপের ২৪ জনের মাঝে ১৩ জনই ন্যাড়া, এ যেন ন্যাড়ারই জাহাজ।

চুল ওয়ালারা আমাদের দেখে হাসবে কি যার মাথায় চুল আছে তাকে দেখেই আমরা হাসতাম, আমাদের জ্বালাতনে ৩/৪ জন সেনিওর বড় ভাই ও ন্যাড়া হয়ে আমাদের দলে এসেছিল।

জাহাজের হ্যাচের মধ্যে (যেখানে মালামাল নেওয়া হয়) ন্যাড়া / চুল ওয়ালা ক্রিকেট খেলা হয়েছিল।

আমাদের ১৩ ন্যাড়া কে সার্টিফিকেট দেওয়া হয়েছিল যে আমরা ইকুয়েডর ক্রস করে একবার ন্যাড়া হয়েছি, সেটা এখনো জাহাজে যাওয়ার সময় নিয়ে যাই না জানি আবার কবে এটা কাজে লাগে।

১ম_ভিন্ন_দেশে_পুলিশে_ধরাঃ
যেবার আমাদের ন্যাড়া করা হয়েছিল সেবারই এই ঘটনা ঘটেছিল। আমরা শপিং এ গিয়েছিলাম ইন্দোনেশিয়ার বাররু সিটিতে। ওখানের একটা বিখ্যাত মসজিদে ঈশার নামাজ আদায় করে ফিরছিলাম।

রাত প্রায় ১১ টা আমরা ৪ জন একসাথে আমি, চিফ কুক, এক্স নেভি ফারুক আংকেল, আর মোল্লা ভাই।

আমাদের অন্যায় ছিল এত রাত্র আমরা ফুটপাতে এলোমেলো হাটছিলাম, ৪ জনের ৩ জন ন্যাড়া, ফারুক আংকেল ছিল আফ্রিকান দানবের মত মাথায় চুল আছে, বাকি ৩ জন আমাদের মাথায় চুল নেই ৩ জন ই ফারুক আংকেলের কাছে বাচ্চা।

ইন্দোনেশীয় দের আইডিয়া ছিল আমরা কোন বাইরের কোন সংস্থা আর ফারুক আংকেল আমাদের লিডার।

যাই হোক রাস্তায় হাটছিলাম হঠাৎ ছোট্ট বেঁটে একটা ছেলে কালো জ্যাকেট, কালো বাইক মানে আপাদমস্তক কালো সে এসে আমাদের কাছে দারাচ্ছিল আবার পেছনে চলে যাচ্ছিল কয়েকবার এমন করার পর আমাদের রাস্তা আগলে দারালো।

আমাদের পরিচয় জানতে চাইলো, মেরিনার পরিচয় দেওয়াতে ছেরে দিয়ে চলে গেল কিন্তু একটু পরেই আবার ৪/৫ টা বাইক সহ এসে আবার আমাদের আইডি দেখতে চাইলো, আইডি দেখালাম,

শোর পাশ দেখালাম সবই ঠিক ছিল কিন্তু ঝামেলা বাঝলো অন্য জাইগা, আমাদের শোর পাশে আমাদের এজেন্ট এর সাইন আছে কিন্তু তারিখ নাই।

আমরা কয় তারিখ পর্যন্ত থাকতে পারবো এ দেশে সেটাও উল্লেখ আছে নেই শুধু সাইন এর নিচে তারিখ।

এখন তো পুলিশের সুযোগ ওকিটকি তে গাড়ি আস্তে বল্লো আমাদের নিয়ে যাবে থানায়, আমরা বুঝতে পারছিলাম না আসলেই পুলিশ নাকি এরা হাইজ্যাকার।

তাদের ফটো আইডি দেখতে চাইলাম নিঃসংকোচে তা দেখালো আর আমাদের নিয়ে গেল থানায়।

আমাদের এজেন্ট কে কল দিল রিসিভ হলো না তখনই ইন্সপেক্টর রিজন বাইক নিয়ে চলে গেল এজেন্টের কাছে। এদিকে আমরা জাহাজে ফোন দিলাম ক্যাপ্টেন স্যার বললেন কোন সমস্যা নেই নির্ভয়ে থাকো,ওরাই জাহাজে দিয়ে যাবে।

ক্যাপ্টেন স্যার আসতেন কিন্তু আসলেন না কারন ওনার ও শোর পাশের আমাদের মতই ডেট নেই, সবারই একই ঝামেলা।

আমাদের জুস ও ব্রেড খেতে দেওয়া হলো, টিভি দেখতে বল্লো,আর বল্লো চাইলে আমরা সুয়ে রেস্ট নিতে পারি সেই ব্যাবস্থাও আছে কিন্তু মানুষ ৪ জন বেড মাত্র ২ টা।

তাই বসেই কথা বলছিলাম সবাই, পুলিশ রা যথেষ্ট ফ্রেন্ডলি বিহেইভ করছিল কিন্তু আমাদের মনে ভয় যাচ্ছিলই না,না জানি কি হতে চলেছে।

এর মাঝে একজন আমাদের কাছে ডলার চেয়েছে, ক্যাপ্টেন স্যার কে জানালাম বলে দিলেন বলো লিখিত দিলে সব দিব।

তার পর থেকে আর তেমন কিছু বোঝায়নি। রাত ২ টার দিকে ইন্সপেক্টর ফিরে এসে আমাদের কে গাড়ি করে জাহাজে দিয়ে গেলেন, আর জাহাজের গ্যাঙওয়ে ( জাহাজে ওঠার সিরি) দিয়ে ওঠার সময়ের ছবি তুলে নিয়ে চলে গেল।

আমরা জাহাজে আসতে না আসতেই সবাই জানতে চাইছিল আমাদের মারছে নাকি? হা হা হা, অবশেষে ক্যাপ্টেন স্যার বললেন আমাদের আটকেছে এর হিসাবই ওদের দিতে হবে কঠিন ভাবে আর মারবে???

১ম_সাইক্লোনঃ

১ম সাইক্লোনে পরেছিলাম সাউথ চাইনা সাগরে। সাইক্লোন আমাদের দিকে ধেঁয়ে আসছে এটা ওয়েদার ফ্যাক্সোমেইল এ জানতে পেরেছিলাম প্রায় ১.৫ দিন আগে রাত ২ টার দিকে।

তখন আমি আর সেকেন্ড অফিসার ব্রীজওয়াচে ছিলাম, মেইল আসার পর সেকেন্ড অফিসার ক্যাপ্টেন স্যার কে কল করে জানালেন,

ভাবলাম ক্যাপ্টেন স্যার কে জানানো হয়েছে হয়তো জাহাজ অন্য দিকে ঘুরিয়ে নিবেন যেন আমরা সাইক্লোনে না পরি, কিন্তু না মেরিনার রা কিছুকে বয় করেন না, মরন কেও না, আল্লাহ্‌ আমাদের সাথে আছেন না হলে এমন সীমানাহীন উত্তাল সাগরে এই ক্ষুদ্র লোহার জাহাজ নিয়ে ভেসে বেড়ানো সম্ভব হতো না।

ক্যাপ্টেন স্যার ব্রীজে এসে অর্ডার দিলেন সবাই ডেক (অ্যাকোমোডেশন বা থাকার বিল্ডিং এর বাইরে খোলা আকাশের নিচের পুরো যাইগা টাই ডেক) এ যেয়ে সব কিছু ভাল মতো সিকিউরড করতে। সবাই কিছুটা ভয়ের মাঝেই কাজ করে যাচ্ছিলো আর আমার তো বুকে পানি নেই, ভেবেছিপাম এটাই বুঝি জীবনের শেষ যাত্রা কিন্তু আল্লাহ্’র তেমন কিছুই হয়নি।

১ম_স্টেয়ারিংঃ

১ম স্টেয়ারিং করেছিলাম এরাবিয়ান সাগরে, মনে ধুকবুক করছিলো, এত্ত বড় একটা জাহাজ আমি চালাবো, আমি স্টেয়ার করবো?

না জানি কত্ত শক্তির দরকার, কিন্তু স্টেয়ারিং হাতে নিয়ে তেমন কিছুই মনে হয়নি, এত প্রাইভেট কার এর স্টেয়ারিং এর মত, এক আঙুল দিয়েও কন্ট্রোল করা সম্ভব কিন্তু হেল্ম-অর্ডার গুলা একটু আওলাঝাউলা হয়ে যেত ১ম দিকে।

 

লেখক মেরিনার রাশিদুল ইসলাম স্বপ্ন এর ছবি

১ম_শোর_ও_শপিংঃ

১ম শোরে গিয়েছিলাম থ্যাইল্যান্ডের কোহসিচাং। সকাল থেকে দুপুর ২ টা পর্যন্ত রবিনসোন শপিং মলে ছোট খাট কেনা কাটা খাওয়া আর ঘোরা।

অর্ধনগ্ন হাজার হাজার মানুষের মধ্যে আমরা কয়েকজন ছিলাম পুরো কাপরে, চোখ তুলে তাকাবার অবস্থা ছিল না, আমি ১ম এমন পরিবেশে নিজেকে খাপ খায়ে নিতে পারছিলাম না। তার পর সবাই গিয়েছিলাম পাটায়া/পাতায়া।

আমার দেখা পৃথিবীর শেরা নোংরা যাইগা হল পাতায়া সিটি।

এ যেন অর্ধনগ্ন এলাকা থেকে পালিয়ে বেঁচে পুরো নগ্ন এলাকায় ঢুকে পরেছিলাম। সমুদ্রতীরে সব ওয়েস্টার্ন টুরিস্ট মেয়েরা বালিতে সুয়ে আছে বাজে ভাবে, সমুদ্র জলে গোসল দিয়ে এসে বাচ্চাদের মত কাপর বদলাচ্ছে একটা খুলে।একটা পরা, আশেপাশে এত মানুষের মাঝেও যেন তারা কাওকে দেখছেই না।

আর সব চাইতে অবাক হয়েছিলাম সেখানের ওয়াকিং স্টেটে যে সব হাজার হাজার পরীর মত সুন্দরী প্রস্টিটিউট হাতে প্লেকার্ডে রেট লিখে দারিয়ে আছে, বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গি দিয়ে কাস্টমারের দৃষ্টি আকর্ষন করছে। দিনে দুপুরে এমন অবস্থা আমিনাগে ভাবিও নি কখনো।

যাই হোক সেখানেই এক বোরখা পরা বোন কে দেখলাম চলমান হোটেল খুলেছে হালাল খাবারের, খাবারের সন্ধানে যেয়ে জানতে পারলাম বোনের বাড়ি বাংলাদেশের ময়মনসিংহ জেলায়, স্বামী-স্ত্রী ও ২ বাচ্চা নিয়ে এখানেই থাকেন, স্বামী ও দ্বীনদার।

স্বামী ঢাকা থেকে কাপর এনে দোকান করে আর স্ত্রী খাবারের হোটেল। তাকে দেখেই সস্তি পেয়েছিলাম, যে ভাল থাকতে চায় সে হাজার খারাপ পরিবেশেও ভাল থাকতে পারে, আলহামদুলিল্লাহ্‌। স্যালুট বোনটি কে।

১ম_ফরেন_বন্ধুঃ

আমার ১ম ফরেন বন্ধু অ্যান্ডি মারওয়ান ইউসুফ। ইন্দোনেশিয়ান মুসলিম। পরিচয় হয়েছিল ইন্দোনেশিয়ার কালিমান্তান এ আউটার এংকরে।

এসেছিল কার্গো সুপার ভাইজার হিসাবে, আমাদের থেকে একটু বেশি বয়স হবে। অমাইক একটা ছেলে এখনো আমাদের খুব ভাল যোগাযোগ আছে। আমি তার কাছে কিছুটা ঋণী ও আছি, যদিও সেটা তার গিফট ছিল তবুও ইন্দোনেশিয়া আবার গেলে সেটা ফেরাতে চেষ্টা করবো।

১ম_আশাহতঃ

আমরা ইন্দোনেশিয়া থেকে কয়লা নিয়ে চাইনা যাওয়ার পথে যে পরিমান রোলিং পিছিং খেয়েছি বলাফ বাইরে, অবশেষে চাইনা পৌছালাম, বার্থিং (জাহাজ পোর্ট এ বাধা) হলো মাত্র তখনই খবর এল সীডর জাতীয় কোন সামুদ্রিক ঝর আঘাত হানতে পারে চাইনা তে।

খুভ ভয় লাগছিল এর মাঝে আবার পোর্ট কন্ট্রল জানালো আমরা জেন জাহাজ নিয়ে সমুদ্রের মাঝে চলে যাই, কিনারে থাকা যাবে না।

এ যেন মড়ার উপর খাড়ার ঘা। যেখানে ঝর এলে সবাই মানুষ কে ডেকে ঘড়ে নেয় সেখানে আমাদের সমুদ্রের ঝড়ের মাঝে পাঠানো হচ্ছে।

অবশ্য সেটাই আমাদের জন্য সেইফ,কিন্তু তখন ত তা বুঝতাম না। খুব খারাপ লেগেছিল সেদিন, মনে হচ্ছিল মা বাবা ছাড়া এতিম মানুষ আমরা তাই আমাদের এভাবে বিপদের মুখে ঠেলে দেওয়া হলো।

১ম_জাহাজে_ঈদঃ

১ম জাহাজে ঈদ হয়েছিল ভিয়েতনামের কোষ্টালে। বাংলাদেশের একদিন আগেই ঈদ হলো, তখন কোন যোগাযোগ করার ব্যবস্থা খুব একটা ছিল না। ঈদের দিন সকালে মা কে কল দিয়েছিলাম স্যাটেলাইট কার্ড থেলে, শুধু জানতে চেয়েছিলাম মা।

ভাল আছো, আজ আমাদের এখানে ঈদ, আর কোন কথা বলতে পারিনি। প্রায় ৬/৭ মিন চুপ করে থেলে চোখ মুছতে মুছতে রুমে চলে এসেছিলাম। দিন টা যে কেমন কেটেছিল বলার বাইরে। সেই দিন টাও হাফ টাইম ডিউটি করতে হয়েছিল।

পরের দিন বাংলাদেশে ঈদ, সবাই কি করছে, আমাকে ভেবে মা এর মন খারাপ এগুলা ভেবে কতটা ভাল ছিলাম জানিনা। দিন ২ টা নরক যন্ত্রনায় কেটেছিল।

জাহাজি দের ঈদ যে কতটা কষ্টের যারা সাফার করে তারা ছাড়া এটা কেও অনুধাবন ও করতে পারবে না।

১ম_সাইনঅফ_ও_বাড়ী_ফেরাঃ

আহ কি মজা আর মাত্র ৩ মাস পর বাড়ি যাব। ৩ মাস আগে থেকেই ব্যাগ গোছানো শুরু করেছিলাম। বাড়ি যাব ভেবেই মন টা ভাল থাকতো।

প্রতিটা দিন ক্যালেন্ডারের তারিখ কাটতাম, একেক টা দিন যেন ৭ দিনের সমান যাচ্ছিল। মাঝে মাঝে ইচ্ছা করেই ক্যালেন্ডারের ডেট কাটতাম না, পরের দিন যখন একসাথে ২ টা ডেট কাটতাম একটা অন্যরকম ভাল লাগা কাজ করতো মনে।

আমি ১ম যে কম্পানির জাহাজে ছিলাম সেটা মাঝে মাঝে বাংলাদেশে আসতো, সবাই ৩/৪ দিন করে ছুটিতে বাসায় যেত আমাকে ছুটি দেওয়া হতো না আমি নতুন, ছোট মানুষ, বিয়ে করিনি বাসায় যাওয়ার কি দরকার? ইত্যাদি অজুহাত থাকতোই আমার জন্য রেডী তাই আর ছুটিতে বাসায় যাব আসাও করতাম না, যে শিপ দেশে আসে না এমন কি এসিয়া তেও আসেনা সেখানেও তো মানুষ আছে।

এভাবেই ১৪ মাস একটানা জাহাজে থাকার পর আমার সেই সুখের দিন টা এলো। আমি যেদিন বাড়ি যাই সেদিন ছিল আমার ও আমার ফ্যামিলির ঈদ।

আজকের_আমিঃ

এখন আমি বদলে গেছি, নাকি বদলাতে বাধ্য হয়েছি জানিনা। এখন আর ঝড় তোফান, আইলা সিডর আমার মুখের হাঁসি টাও কেরে নিরে পারে না। যাই হোক আল্লাহ্‌ ভরসা। এমন হাজার টা সীডর সাইক্লোন আইলা নারগীস একজন নিত্য দিনের সংঙ্গী।

তবে এখনো বাড়ির জন্য, আপন জনদের জন্য, মা এর জন্য, বন্ধু-বান্ধব এর জন্য সেই আগের মতই খারাপ লাগে। আসলেই বন্ধুবান্ধব ও আপন মানুষ গুলারে কত্তটা ভালবাসি সেটা বোঝার জন্য দূরে থাকা টা জরুরী।

মা মাটি ও মানুষের জন্য সবার মাঝেই একটা সফট কর্নার রয়েছে কিন্তু দূরে না গেলে সেটা বোঝা যায় না।
তবে চাঁদনী রাতে যখন মনে হয় জাহাজ আর একটু আগালেই চাঁদটা ধরতে পারবো,

যখন সামুদ্রিক বার্ড ফিস গুলা পানির নিচ থেকে আকাশে উরাল দিয়ে আবার পানিতে ডুব দেয়,
যখন সী-বার্ড আকাশে উরতে উরতে হঠাৎ সমুদ্রের লোনা পানির নিচে ডুব দেয়, মাছ ধরে, রাজ-হাসের মত পানিতে বসে থাকে,মন চাইলে আবার উড়াল দেয়,

যখন গভীর সমুদ্রে কোথাও বিশাল পাহার মাথা উচু করে আছে দেখা যায়, যখন ডলফিন গুলা জাহাজের সাথে পাল্লা দিয়ে লাফিয়ে চলে স্ব-দলে তখন মনে হয় পৃথীবির সব চাইতে জয় উল্লাস আর ভাল লাগার জায়গাতেই মেরিনারদের বসবাস।

১৮.০৩.১৮ রাশিদুল ইসলাম স্বপ্ন, সাউথ আটলান্টিক মহাসাগর, ব্রাজিল-ইরান।

এই ছিলো তার গল্প । তার ফেসবুক ওয়াল থেকে লেখাটা নেয়া । বাংলাদেশ তোমাদের নিয়ে গর্বিত । আমরাও গর্বিত ।

ছবি সংগ্রহ ঃ পিক্সাবাই.কমপিক্সলেস.কম থেকে 

0Shares

Check Also

আরিফ আজাদের সম্পাদনায় মা মা মা এবং বাবা

Somokalin Prokashon এর প্রকাশক একদিন আমাকে বললেন যে তাদের একটা বই সম্পাদনা করে দেওয়া লাগবে। বই …

বেঙ্গল মিট প্রসেসিং ইন্ডাষ্ট্রিজ লিঃ (Bengal Meats), পাবনা, কাশিনাথপুর, বাংলাদেশ ।

দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় হালাল মাংশের কারখানা। বাংলাদের ব্র্যান্ডিং জগতের অন্যতম নাম তথা পাবনার সকল ব্র্যান্ড …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *