বাংলাদেশের ক্রিকেট নিয়ে একটা সময় সবাই হাসাহাসি করতো ।

প্রতি ম্যাচে খুবই দুশ্চিন্তাযুক্ত মুখে আকরাম খান টস করতে আসতো, ওপেনিং ব্যাটসম্যান প্রথম পাচ ওভারের মাঝে একজন চলে যেত, তারপর শুধু একের পর এক ব্যাটসম্যানের আসা আর যাওয়া।

বাংলাদেশ ক্রিকেট ( গুগোল থেকে সংগ্রহিত )

 হাবিবুল বাশার চেষ্টা করতেন কোনমতে পঞ্চাশ পার করার, পাইলট সিংগেল নিয়ে স্কোরটা একশো পার করতেন আর মোহাম্মদ রফিক চোখ বন্ধ করে খেলতেন জিন্জিরার হেলিকাপ্টার শট ।

হাস্যকর একটা স্কোর নিয়ে তারপর আমরা বোলিং করতে নামতাম। হাতের সুখ মিটিয়ে প্রতিপক্ষেরা আমাদের বোলারদের তুলোধুনো করতো । টার্ন না করা মনির বল, অথবা পেসহীন সুজনের হাফ লেন্থ ডেলিভারী – বাংলাদেশকে কেউ কখনো গোণায় ধরেনি ।

এখন গোণায় ধরে ।
হাটি হাটি পা পা করে বাংলাদেশের ক্রিকেট এখন অনেকটা পথ এগিয়ে এসেছে । অনেক অর্জন আমাদের ক্রিকেট থেকে, অনেক সম্ভাবনা আমাদের ক্রিকেট নিয়ে, অনেক প্রত্যাশা আমাদের ক্রিকেটে নিয়ে । আমাদের শতবিভক্ত মানুষগুলো টিভির সামনে বসে ভাই হয়ে যায়। যেসব দলগুলো আমাদের নিয়ে হাসিতামাশা করতো, তারা এখন আমাদের ভয় পায় । আমাদের প্লেয়ারদের নিয়ে এ্যানালাইসিস করে । তাদের সমর্থকেরা ফেসবুকে টুইটারে আগে সহানুভূতির সাথে কথা বলতো, এখন রাগে গালাগালি করে ।

বাংলাদেশ ক্রিকেট ( গুগোল থেকে সংগ্রহিত )

আর এই সমীহটা আমাদের কেউ ভিক্ষা দেয় নাই, খয়রাত দেয় নাই, এইটা আমরা অর্জন করে নিসি ।
শয়ে শয়ে ম্যাচ হারার পরে, হাজার হাজার রান দেবার পরে আমরা একটা একটা করে প্লেয়ার বের করে আনসি । তাদের ওপর ভরসা রাখসি, তারা আমাদের ভরসার প্রতিদান দিসে । আগে একজন প্লেয়ার এক ম্যাচ খারাপ করলে পরের ম্যাচ থেকে গুম হয়ে যাইতো, এখন আমরা সেটাকে বন্ধ করে দিসি । গ্রিনিজ, হোয়াটমোর, স্ট্রিক, হাতুড়িসিংঘের অবদানকে ছোট করে দেখবেন না, তারা অনেক কিছু দিয়ে গেছেন আমাদের ক্রিকেটকে ।

আজকে আমাদের মাঠে ব্যবহার নিয়ে সমালোচনা হয় ।
সাকিব আল হাসানকে ‘বেয়াদব’ বলতেসে যেই ক্রিকেটবিশ্ব – আমরা গত বিশ বছর থেকে তাদের বেয়াদবির শিকারমাত্র । সন্জয় মান্জারেকার বলতেসে সাকিবের আচরণ হতাশাজনক, সুনীল গাভাস্কারের মত লিজেন্ডরা সমালোচনা করতেসে সাকিবের ব্যবহারের – তারা হয়তো ভুলে গেসেন ক্রিকেটবিশ্বে কোন ব্যক্তিকে নয়, ‘বেয়াদব’ বলতে আদতে একটি দেশকে বোঝানো হয়, যে দেশটা কোনভাবেই বাংলাদেশ নয় ।

বাংলাদেশ ক্রিকেট ( ছবিঃ গুগোল থেকে সংগ্রহিত )

আমরা ছোটবেলায় অস্ট্রেলিয়া দলকে দেখতাম । চূড়ান্ত এ্যাগ্রেসিভ একটা দল । ম্যাথু হেইডেন খেলা শুরুর আগে ক্রিজে কিছুক্ষণ ব্যাট নিয়ে বসে থাকতো, বোলারের দিকে তাকিয়ে, অপরপার্শ্বে গিলক্রিস্ট ওয়ার্মআপ করতো । দুনিয়ার এমন কোন বোলার নাই, এই দৃশ্য দেখে যার কলিজা ঠান্ডা হয়নাই । মাঠে স্লেজিংএর বন্যা বইয়ে দিত এই দলটা । দিনশেষে কিন্তু এই এ্যাগ্রেসিভ এবিউসিভ দলটার নামের পাশেই লেখা থাকতো – চ্যাম্পিয়ন ।

যে বেয়াদবীর অভিযোগে সাকিব আল হাসান অভিযুক্ত, খোদ সুনীল গাভাস্কার নিজেই সেই কাজ করে গেছেন ১৯৮১ সালে । আজ সুনীল গাভাস্কার সাকিব আল হাসানের অতি আবেগি কর্মকান্ডের নালিশ জানান আইসিসি’র কাছে। তিনি নিজেই মাঠে আউট দেয়ার কারনে আম্পায়ারের সিদ্ধান্ত অমান্য করে নন স্টাইকে থাকা ব্যাটসম্যনসহ মাঠ ছেড়ে উঠে গিয়েছিলেন । যে শ্রীলঙ্কার সমর্থকেরা আজ সাকিব আল হাসানের বিচার চায়, তারা ভুলে গিয়েছে যে সেই একই কাজ অর্জুনা রানাতুঙ্গা করে গিয়েছেন বহুবছর আগে । মহেন্দ্র সিং ধোনী মুস্তাফিজকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেন, বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে আমাদের নো-বল বিতর্কে হারানো হয় অথচ দিনশেষে ওই কেষ্টা বেটাই চোর । আজকে তাই কোহলির আচরণ হয় ‘পজিটিভ’ আর সাকিবের আচরণ হয় ‘ফ্রাসটেটিং’ ।

সমস্যা আসলে সেই জায়গায় না, সমস্যা অন্য জায়গায়।
সমস্যাটা হলো, আপনার জুনিয়র যখন আপনাকে হ্যালির ধূমকেতুর মত অতিক্রম করে যায়, তখন জ্বালাটা অনেক বেশি হয় ।

যে সন্জয় মান্জারেকার আজ সাকিবের আচরণ নিয়ে হতাশ, সে নিজে কোনদিন সেরা দশেও ছিলো না। সাকিব পৃথিবীর একনাম্বার অলরাউন্ডার না হলে তার মাঝে এটা নিয়ে কোন হতাশা থাকতো না । যে সুনীল গাভাস্কার আজ সাকিবের অতি আবেগী আচরণের সমালোচনায় শামিল, যদি আমরা বিশ্বকাপের মত চোখ বুজে অন্যায় মেনে নিতাম, তিনিও কিছু বলতেন না । যদি আজকে বাংলাদেশে আকরাম খানের বাংলাদেশ দল হয়ে থাকতো, একটা বারও কেউ কোন কথা বলতো না এটা নিয়ে ।

কিন্তু, আমরা দাদাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছি, আমরা শুধু খেলতে জানি না, আমরা প্রতিবাদও করতে জানি । আমাদেরও এ্যাটিউড আছে, গাটস আছে । ক্রিকেট শুধু ফিজিক্যাল স্পোর্টসই না, এটা অনেক বড় সাইকোলজিক্যাল একটা ওয়ার । আগামীবার থেকে আম্পায়াররা বাংলাদেশের বিপক্ষে পক্ষপাতমূলক সিদ্ধান্ত দেবার আগে চারবার চিন্তা করবে ।

আমাদের একজন ক্যাপ্টেন প্রয়োজন ছিলো, আমরা মাশরাফিকে পেয়েছি । একজন ঠান্ডা মাথার মারকুটে ব্যাটসম্যান দরকার ছিলো, আমরা তামিমকে পেয়েছি । মিডঅর্ডারে একজন খুটি দরকার ছিলো, আমরা মুশফিককে পেয়েছি । একজন ফিনিশার দরকার ছিলো, মাহমুদুল্লাকে পেয়েছি। আমাদের একজন কাটার দরকার ছিলো, মোস্তাফিজকে পেয়েছি ।

এবং আমাদের একজন ‘বেয়াদব’ দরকার ছিলো । খুবই দরকার ছিলো ।
আমরা হয়তো ভারতের সাথে ম্যাচটা হেরে যাবো, ব্যাপারনা । আরো দশটা ম্যাচ হারবো – ব্যাপারনা । আরো অনেক টুর্নামেন্ট হারবো – ব্যাপারনা । আমাদের হারার অভ্যাস আছে । এভাবে হারতে হারতে একদিন আমরা জিততে থাকবো । ম্যাচের পর ম্যাচ, সিরিজের পর সিরিজ, কাপের পর কাপ । আমরা অস্ট্রেলিয়ার মত এ্যাগ্রেসিভ হবো, পজিটিভ হবো ।

তারপর আমাদের একদিন মনে হবে, আমাদের বিশ্বকাপটা খুবই দরকার ।
লেখক: Shamim sharif সংগ্রহ: সাদা এ্যাপ্রন থেকে । 

4Shares

Check Also

islamic news

“ভারতের সংখ্যালঘু মুসলমানদের বিভিন্ন অজুহাতে হত্যা নির্যাতন ও হয়রানি বন্ধে করণীয়” শীর্ষক গোলটেবিল হয়েছে জাতীয় প্রেসক্লাব মিলনায়তনে।

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় কমিটির আয়োজনে বৈঠকে সভাপতিত্ব করছেন সংগঠনের সিনিয়র নায়েবে আমীর মুফতী সৈয়দ …

A 5G-Enabled Foldable iPad

৫ জি আইপ্যাড আসছে। 5G-Enabled Foldable iPad

অ্যাপেল এমন একটি প্যাড নিয়ে আসছে যেটা ৫জি নেটওয়ার্ক সাপর্ট করবে । অ্যাপেলের এই নোটকে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *