পাসপোর্ট ভেরিফিকেশন ও ভোগান্তির কাহিনী – রাহাত সাইফুল আশরাফ

আমার স্ত্রী ও পুত্রের পাসপোর্ট করাবো। জরুরী প্রয়োজন। দুইজায়গা থেকে জানলাম এক ঠিকানা দিলে তাড়াতাড়ি হয়। এবং বর্তমান ঠিকানারটা দেয়াই ভালো যদি সরকারী স্ট্যাম্পে স্থায়ী ঠিকানার উল্লেখ থাকে। আছে যেহেতু দিলাম, আর্জেন্ট আবেদন করলাম ৬৯০০টাকা করে। পুলিশ ভেরিফিকেশনের উদ্দেশ্যে ফোন আসলো। আমি যথারীতি সত্য বললাম। পুলিশ জানালো এভাবে হবেনা, স্থায়ী ঠিকানা লাগবেই। যদি উর্ধতন কেউ বলে তবেই শুধু ভেরিফিকেশন দেয়া যাবে। আমি কি করি? চেষ্টা করলাম, অনেক টাকা চাইলো। আমি টাকা দেবোনা, প্রয়োজনে আবার করবো।

হেল্প নিলাম আমাদের ভার্সিটির ছোটভাই মুকুলের। ও যথাসাধ্য চেষ্টা করলো। হলোনা। জানালো ভাই ভুল করেছেন, আবার এপ্লিকেশন করেন। স্থায়ী ঠিকানা দিয়েন। মুকুলের আন্তরিক চেষ্টায় আমি কৃতজ্ঞ।

যেহেতু নিজের ভুল (হবার সম্ভাবনা বেশি, এখনো স্পষ্ট জানিনা ভুল হয়েছে কিনা দুইরকম ফিডব্যাকই পেয়েছি) তাই বললাম ওকে। মুকুল বলে দিলো যাতে পুলিশ আপত্তিপত্র পাঠিয়ে দেয়। আপত্তিপত্র আর পাসপোর্ট অফিসে যায়না। এরমধ্যে দিন পনেরো শেষ। আমি এসবি লোকাল শাখাতে ফোন করে অনুরোধ করলাম কাগজটা পাঠিয়ে দিতে, তিনবার অনুরোধ, হলোনা। সার্কেল এসপির কাছে ফোন দিলাম নম্বর যোগার করে। দুইবার উনার সাথে কথা হলো। উনি সংশ্লিষ্ট জায়গায় জানালেন, আমি জানলাম চলে গেছে আপত্তিপত্র। এরপরেও একসপ্তাহ চলে গেছে। আরেক ছোটভাই পুলিশের এডিশনাল এএসপি। তার সহায়তা নিলাম এরপরে গিয়ে আপত্তিপত্র পৌছালো পাসপোর্ট অফিসে। এরমধ্যে একমাস পার হয়েছে। রিএপ্লিকেশন করে জমা দিলাম। এবার দুই ঠিকানাই দেয়া।
দ্বিতীয়বার পুলিশি ভেরিফিকেশনের ফোন আসলো।

একই বাসার ঠিকানা মা ও নাবালক পুত্রের। অথচ দুজন অফিসার ফোন দিলো দুজনের জন্য। জিজ্ঞেস করলাম একইবাসা একজনই তো নিয়ে আসতে পারেন আমার একটু তাড়াতাড়ি দরকার।
অফিসার রাফভাবে জানালেন – আপনার আমার কথায় তো হবেনা। দুইজনই দুইজনের ভেরিফিকেশনের জন্য আসবে। অফিসের নিয়ম।এইটা আমাদের বাড়তি কাজ এইটা আমাদের করার কথা না। আমি আক্কেলগুড়ুম – কয় কি!

নিয়ম মেনে একজন অফিসার আমার স্ত্রীর পুলিশি ভেরিফিকেশনে আসলেন আমাদের বাসার সামনে ফাস্টফুডের দোকানে। ভেরিফিকেশন শেষ।

আমি বললাম টাকা দিয়োনা। যদি চায় জিজ্ঞেস করো বিনীতভাবে। গিন্নি যথেষ্ট ভদ্র ও পার্সোনালিটিসম্পন্ন মহিলা। অফিসার সরাসরি বললেন টাকার কথা, বললেন এইটা অফিসের খরচ। পাচশ টাকা দেয়া হলো। অফিসার সাথে সাথে টাকা টেবিলে রেখে আরেকজনকে ফোন দিয়ে ক্ষাণিক মেজাজ দেখালেন ও গিন্নিকে খুবই আপত্তিজনক ভংগিতে বললেন – আরে আপা বসেন বসেন। জানেন তো না খরচ আছে। এইটা কি দিলেন? এইটা অফিস খরচ। মিনিমাম একহাজার দেন।

আমার গিন্নি আর কথা বাড়াতে চাইলেন না। একহাজার টাকা দিয়ে চলে এলেন। উনার দৃষ্টির সামনে বেশিক্ষণ থাকতে চাইলেননা। টাকাটা দিয়েই দিলেন।

পরদিন আমি যাবো আমার পুত্রের ভেরিফিকেশনের কাগজ নিয়ে। আমি ফোনে ভেরিফিকেশন অফিসারকে জানালাম – আপনি কি বাসায় আসবেন?
উনি জবাব দিলেন – এইটা আমাদের কাজ না, আপনি অফিসে আসেন অথবা একটা জায়গার কথা বললেন ওখানে আসেন সকালে।

আমি জানালাম আগামীদিন শুক্রবার আমি ওখানে আসবো।

সকালে সকল কাগজ নিয়ে গেলাম। উনি কেস নম্বর লিখলেন। আমি বললাম থ্যানক্স। উনি বললেন দুইহাজার দেন।

আমি – কেনো ভাই?
অফিস খরচ। অফিসের খরচা আছে।
আমি- জ্বী এরকম কোন খরচের কথা তো জানিনা। আপনি আমাকে ছুটির দিনে সময় দিচ্ছেন আমি পাচশ টাকা দিচ্ছি। প্লিজ কাজটা করে দেন।
উহু দুই হাজার, নইলে আমি লিখে দেবো আপনি অফিস্খরচ দিতে রাজী হননি, আপনার ভেরিফিকেশন হবেনা।
কয়েকবার অনুরোধ করলাম। মানলেন না। রেগে গেলেন। বললেন অফিস খরচ লাগবেই, বড় জায়গায়ও এই খরচ যাবে।
আমি বিরক্ত হলাম তবুও বিনীতভাবে বললাম-অফিস খরচ হলে তো রিসিট থাকবার কথা। রিসিট দিতে পারবেন?
না রিসিট নাই। দিলে দেন নাইলে কাজ হবেনা।
আমি- চলুন অফিসে চলুন অফিস খরচ অফিসে দিয়ে আসি। দুইহাজার না, লাগলে দশহাজার দেবো।
এখানে দিবেন কিনা বলেন? আমার বহুত কাজ আছে।
দিবো তো, পাচশো দিবো।
আপনার স্ত্রীর ভেরিফিকেশনে উনি কতো দিছেন।(দেখুন উনি জানেন আমার স্ত্রীরটাও এসেছে)
আমি সত্য বললাম – একহাজার নিয়েছে। পাচশোই দিয়েছিলাম, মানেননি, মিনিমাম একহাজার টাকা।

ওকে একহাজারই দেন।
উহু উনি তো বাসায় গিয়েছিলেন, আপনাকে বলেছিলাম আপনি যেতে রাজী হননি। গেলে একহাজারই দিতাম, অফিস খরচ হিসেবে না। বাসায় গিয়েছেন তাই দিতাম।

আরে ভাই ওইটার জন্য ওই অফিসারকে দিলেন, আমি কি দোষ করছি আমাকে পাচশো দিবেন? একহাজার দেন।
আমি- উহু না। পাচশোই দেবো। প্লিজ করে দেন।
না, হবে না।
আপনার অফিসের নম্বর দেন, কথা বলি।
আরে ভাই বুঝতেসেননা ক্যান, কথা ঘুরান বেহুদা। একজন অফিসার ট্রান্সফার হইতেই পাচলাখ মিনিমাম লাগে, এই খরচগুলা বুঝেননা ক্যান। আপনি না দিলে আমার নিজের পকেট থাইক্কা দিমু নাকি আমি? রাগান্বিত।
দেখেন পাচলাখ না দশলাখ সেইটা আমার জানার দরকার নেই। টাকা দিয়ে ট্রান্সফার করায় যেহেতু, হয়তো নিজের সুবিধা আছে তাই করায়। আমি পাচশই দিবো।
না হবেনা, আপনার কাগজ হবেনা।
আপনার নামটা বলেন তো ভাই।
নাম দিয়া কি করবেন। নাম লাগবে ক্যান?
বাহ রে আপনি যদি না করেন তবে আমাকে অভিযোগ করতে হলে ভেরিফিকেশন অফিসারের নাম বলতে হবেনা।

অফিসার বেকায়দায় পড়ে অভিমান নিয়ে বললেন – যান আপনার দেয়া লাগবেনা। নাম দিয়া আমার চাকরী খাইতে চাইলে খান দেখি পারেন কিনা।
না ভাই আমার ক্ষমতা নাই। আমি শুধু আপনার নামটা জানতে চাইছি, জানাতে তো আপনি বাধ্য, তাইনা।
নাম বললেন ও বললেন একহাজার না দিলে লাগবেনা। আপনার কাজ হবে।
আমি বেরিয়ে আসলাম টাকা না দিয়ে।

আমার পুত্রেরটা হলো, কিন্তু গিন্নিরটা আটকে রইলো।
দিন পনেরো ধরে আমি চেষ্টা করলাম। ফোন দিলাম এসবি ডিআইজি অফিসে তিনবার। কোন খবর নাই। পাসপোর্ট অফিসে সাহায্য চাইলাম। ওখান থেকে জানানো হলো – এটা এসবির কাজ উনাদের কিচ্ছু করার নেই। ফোন দিলাম সার্কেল এসপিকে আবার। শেষমেশ জানালো হলো আমার স্থায়ী ঠিকানায় দুইটাই গেছে আবার ভেরিফিকেশন হবে।

অথচ স্থায়ী ঠিকানা থেকে জানানো হলো আমার পুত্রেরটা গেছে, গিন্নিরটা যায়নি। পনেরোদিন ধরে আমি ট্রাই করলাম । অবশেষে আমাকে যেতে হলো সদরঘাট থানায়। গিয়ে জানলাম এটা সম্ভবত যায়নি। কিংবা গেলেও ওরা হারিয়ে ফেলেছে। এখন আমাকে হাতে হাতে নিয়ে যেতে হবে। কেনো যেনো শুধু ওই কেস নম্বরটাতেই একটা মার্ক করে রাখা। ভেরিফিকেশন করিয়ে আবার এখানে এনে জমা দিতে হবে। এখান থেকে পাসপোর্ট অফিসে নিয়ে যেতে হবে।ব্যক্তিগতভাবে এই কাজ আমাকেই করতে হবে।
ওহ খোদা এতো সময় কোথায় আমার?
ওখানে একজন এএসপির কাছ থেকে বাস্তবিক সহায়তা পেলাম উনি ওটা পাঠাতে বললেন ফ্যাক্সে। পাঠানো হলো।
টোটাল তিনমাস পার হয়েছে এখনো পাসপোর্ট অফিসে ভেরিফিকেশন পৌছায়নি আমার স্ত্রীর।

স্থায়ী ঠিকানার ভেরিফিকেশন অফিসার খরচ চাইলেন। আমি বুঝাতে চাইলাম এই টাকাটা কেন দিতে হবে আমাকে।
একই কথা, অফিস খরচ। আমি বিনীতভাবে বুঝাতে চাইলাম। উলটো আমি জ্ঞান পেয়ে গেলাম – বর্তমান যুগে কিভাবে সার্ভিস নেয়া যায়। উনি আমাকে নৈতিকতার শিক্ষা দিলেন। আমি এতোদিনে নৈতিকতা শিখে চালাক হয়েছি, গো ধরা থেকে নিজেকে সরিয়ে মেনে নিতে শিখেছি। খরচ দিয়েছি। এটাই সম্ভবত পুলিশি ভেরিফিকেশনের নিয়ম।

এখনো পাসপোর্ট পাইনি। আরো দুইদিন যেতে হবে একদিন ক্লিয়ারেন্স এর জন্যে। একদিন পাসপোর্ট কালেকশনের জন্যে।

আমি আমার অন্যায় খুজে পাচ্ছিনা। যা পাচ্ছি তা হলো স্রোতের প্রতিকূলে কেবল সৎ থাকার চেষ্টা করেছি। আল্লাহ সহায় হোন।

এখনো কি বলবেন আমি আমার সৎ থাকার চেষ্টায় ত্রুটি রেখেছি!

Facebook Comments
2Shares

Check Also

আগামী ২০ জানুয়ারী ভোলায় আসছেন মুফতী সৈয়দ মোহাম্মদ রেজাউল করীম, পীর সাহেব চরমোনাই

আগামী ২০ জানুয়ারী ভোলায় আসছেন মুফতী সৈয়দ মোহাম্মদ রেজাউল করীম, পীর সাহেব চরমোনাই  মিজানুর রহমান, …

Bangla Golpo

তিন লোভী বন্ধু ও হজরত ঈসা আ:

হজরত ঈসা (আ)-এর জামানার এক ঘটনা। একদিন তিন বন্ধু একসাথে দূরে কোথাও হেঁটে যাচ্ছিল। এরা …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *