‘তিনি এক আজব মানুষ’ – আরিফ আজাদ – Bangla1News

আরিফ আজাদ আজ তার ফেসবুক প্রোফাইলে ড. মুহাম্মদ জাফর ইকবালকে নিয়ে একটি পোস্ট লিখেছেন । এই পোস্টটি দ্রুত কপি-পেস্ট হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে । এই ভাইরাল পোস্টটি চলুন পড়ে নেই ।

তিনি এক আজব মানুষ। এই আজব মানুষ আমাদের মতই খান, ঘুমান, পড়েন-পড়ান। কিন্তু, তিনি মাঝে মাঝে এমনসব কাজ করে বসে বসেন, যা উনাকে অন্যদের চাইতে অনন্য করে তোলে।

তিনি আমাদের কারো সুপার হিরো, কারো কাছে খলনায়ক। কারো কাছে বিরাট দেশপ্রেমিক তো কারো কাছে ভন্ড। এরকম অদ্ভুত সব বিশেষণে বিশেষায়িত এই লোক কখনোই আমাদের হতাশ করেন না।
মোটাদাগে, তিনি একজন সুযোগ সন্ধানী। তিনি শিকারি বিড়ালের মতো সঠিক সুযোগটা খুব সুন্দরভাবে লুপে নিতে জানেন। ‘ঝোপ বুঝে কোপ মারা’ বলে বাংলা সাহিত্যে একটি প্রবাদ আছে। এই আজব মানুষটার কাজকর্ম না দেখলে এই প্রবাদটির মর্মার্থ হয়তো কখনোই আমার বুঝা হয়ে উঠতো না।

বলছিলাম জাফর ইকবাল স্যারের কথা। দেশে সম্প্রতি চলমান ‘কোটা সংস্কার আন্দোলন’ এর ব্যাপারে সবাই যখন হাঁ-হুতাশ করছিলো ‘স্যার কই’ ‘স্যার কই’ বলে, তখনও তিনি পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে ব্যস্ত। দেখছিলেন জল কোনদিকে গড়ায়। যখন দেখলেন,- নাহ, দেশের এলিট শ্রেণীর সবাই মোটামুটি আন্দোলনের পক্ষে আর সরকারও তেমন ঝেড়ে কাশছে না। তাহলে তিনিও এই মূহুর্তে দু’চারটে ‘পক্ষীয়’ কথা বলে স্রোতে একটুখানি গাঁ ভাসিয়ে দিতে পারেন। স্যার চারদিন আগে লিখলেন,-

“কোটাব্যবস্থা যুক্তিপূর্ণ হতে হবে। দেশের প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। বর্তমানে বিদ্যমান কোটা পদ্ধতি সম্পর্কে আমি তেমন ভালো জানি না। তবে যতোটুকু জেনেছি, তা সত্য হলে এটা কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য না। বেসিক্যালি আমি কোটার পক্ষে না। এটা ফেয়ার না।
শিক্ষার্থীদের উপর পুলিশের হামলার ঘটনায় আমি খুব মর্মাহত। পুলিশের এরকম জায়গায় আসা উচিত হয়নি। শিক্ষার্থীদের গায়ে হাত তোলা গ্রহণযোগ্য নয়’। [ ‘কোটা সংস্কার করা উচিত’, মুহাম্মাদ জাফর ইকবাল। ০৯ এপ্রিল, ২০১৮। দৈনিক জনকন্ঠ]

এতোটুকু পড়ে আমরা যারা ‘এইতো স্যার লাইনে চলে এসেছেন’ ভেবে পুলকিত হয়েছি এবং স্যারের মতো মহান মানুষকে আমাদের, অর্থাৎ আন্দোলনকারীদের দলে পেয়ে যারপরানই খুশি হয়েছি, তাদের জন্য স্যার গতকাল আরেকটি বক্তব্য পেশ করেছেন। তিনি বলেছেন,-

“পরদিন খবর পেলাম পুরো ঢাকা শহরকে ছেলেমেয়েরা অচল করে দিয়েছে। একেকটা বিশ্ববিদ্যালয় তাদের নিজেদের এলাকার রাস্তা-ঘাট বন্ধ করে ফেলেছে। ঢাকা শহরের অবস্থা আমরা জানি, শহরের এক কোণায় কিছুক্ষণ ট্রাফিক বন্ধ থাকলেই কিছুক্ষণের মাঝে পুরো শহরে তার প্রভাব পড়ে। কাজেই শহরের বড় বড় ইউনিভার্সিটির ছেলেমেয়েরা সবাই যদি নিজেদের এলাকাকে অচল করে রাখে, তার ফল কী ভয়াবহ হবে, সেটা চিন্তা করা যায় না। এই পদ্ধতিটি নতুন নয়, এর আগেও একবার প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা একই পদ্ধতিতে তাদের দাবি আদায় করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেমেয়েদের সাত খুন মাপ, তারা যখন খুশি পুরো শহর, প্রয়োজন হলে পুরো দেশের মানুষকে জিম্মি করে ফেলতে পারে, তাদের কারও কাছে জবাবদিহি করতে হবে না। তাদের এই কর্মকাণ্ডে যে শিশুটি স্কুলে যেতে পারেনি, যে রোগীটি হাসপাতালে যেতে পারেনি, গার্মেন্টেসের যে মেয়েটি কাজে যেতে পারেনি, যে রিকশাওয়ালা তার পরিবারের খাবার উপার্জন করতে পারেনি, তাদের কারও জন্য দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের এই ছাত্রছাত্রীদের কোনও মায়া নেই। তাদের দাবিটি মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার বা সৈরশাসকের পতনের মতো জাতীয় কোনও দাবি নয়, নিজেদের একটা চাকরি পাওয়ার সুযোগটা বাড়িয়ে দেওয়ার দাবি।
গ্রাম থেকে একটা মেয়ে যদি শহরে এসে গার্মেন্টসে একটা চাকরির চেষ্টা করতো, কিংবা কোনও একজন তার জমি বিক্রি করে মালেশিয়ায় চাকরি পাবার চেষ্টা করতো, তাহলে তাদের পাশে দেশের সব বড় বড় অধ্যাপক এসে দাঁড়াতেন না, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেমেয়েদের পাশে তারা এসে দাঁড়িয়েছেন। সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেমেয়েরা কিন্তু তাদের পাশে যারা দাঁড়িয়েছে, তাদের সম্মানটুকুও রক্ষা করেনি। তারা দেশের মানুষকে জিম্মি করে, যারা তাদের পাশে দাঁড়িয়েছিলো তাদেরও অপরাধী করে দিয়েছে। যদি আমি জানতাম তারা এরকমটি করবে, তাহলে তাদের দাবির বিষয়ে মন্তব্য করা থেকে একশ হাত দূরে থাকতাম”। [ ‘দাবি, আন্দোলন ও আন্দোলনের প্রক্রিয়া, মুহাম্মাদ জাফর ইকবাল। ১২ এপ্রিল ২০১৮, বাংলা ট্রিবিউন]

ছেলেমেয়রা শহর অচল করে দিয়েছে, রাস্তাঘাট বন্ধ করে দিয়েছে এজন্য স্যার খুব মর্মাহত। আমি জানিনা এসব অধিকার আদায়ের জন্য এরচেয়ে সুষ্ঠু আন্দোলন আর আছে কিনা। আচ্ছা, স্যার কি মনে করেন যে ছাত্ররা প্ল্যাকার্ডে ‘কোটা সংস্কার চাই’ লিখে নিজ নিজ বাসার ছাদে বা বাসার নিচে, রাস্তার এক কোণায় দাঁড়িয়ে থাকলে সেটা আন্দোলন হবে? আমি জানি না।
আন্দোলনকারীদের জন্য কতো রোগিই না জানি এম্বুলেন্সের মধ্যে মারা পড়েছে। তাদের জন্য এখন স্যারের খুব মায়া। আন্দোলনের তোপে যে শিশুটি কাঁধ ভর্তি ব্যাগ নিয়ে স্কুলে যেতে পারেনি, তার জন্যও স্যারের অনেক দরদ। গ্রাম থেকে ঢাকা শহরের গার্মেন্টসে চাকরি খুঁজতে এসে যে মেয়েটা ছেলেমেয়েদের ‘কোটা সংস্কার আন্দোলনের’ জন্য ব্যর্থ হয়ে ফিরে গেছে, তার জন্যও স্যারের দুঃখ। যে লোকটা জমি বিক্রি করে মালেশিয়া যাওয়ার জন্য ঢাকা এসে মালেশিয়ার ফ্লাইট ধরতে পারেনি আন্দোলনকারীদের জন্য, তার জন্যও স্যারের হতাশা কাজ করছে।
কিন্তু আমরা প্রশ্ন করতে চাই, কয়েক বছর আগে যখন শাহবাগে দিনরাত আন্দোলন চলছিলো, শাহবাগ মোড়, টিএসসি চত্ত্বর অবরোধ করে যারা দিনরাত মিছিল, শোভাযাত্রা করতো, সেসময় কি কোন রোগি এম্বুলেন্সের মধ্যে মারা যায়নি? শাহবাগ মোড়েই তো দেশের দু’টি বড় হাসপাতাল অবস্থিত। সেই রোগিদের জন্য কি স্যারের মায়া হয়? সেসময় কোন গার্মেন্টস কর্মী তার চাকরির জন্য এসেও ফিরে যায়নি? কোন মালেশিয়াগামী চাকরি সন্ধানী? স্কুলে যাওয়া কোন শিশু কি বাধ্য হয়নি ঘরে ফিরে যেতে? তাদের জন্য কি স্যারের কোন দুঃখবোধ ছিলো? ছিলো না। বরং স্যার তাতে স্বতঃস্ফূতভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু আজ কেনো স্যারের মাঝে এতো দুঃখবোধ কাজ করছে? এই আন্দোলন থেকে ‘দাঁড়ি’ ‘টুপি’ আর ‘ধর্মীয় রাজনীতি’র বিরুদ্ধে কোন স্লোগান উঠছেনা বলে?
স্যার বলেছেন, – কোটা আন্দোলন তো মানবতা বিরোধি অপরাধের বিচার বা সৈরশাসক পতনের মতো কোন জাতীয় দাবিও নয়। নিজেদের একটা চাকরি পাওয়ার সুযোগ বাড়িয়ে দেওয়ার দাবি’।
স্যার কি করে বুঝবেন একটা চাকরি পাওয়াই একজন বেকার যুবকের জন্য জাতীয় দাবির সমান? স্যারেরা তো আমাদের বস্তাভর্তি সার্টিফিকেট ধরিয়ে দেওয়ার জন্য সমস্ত বন্দোবস্ত করেছেন, কিন্তু সেই সার্টিফিকেট কাঁধে যখন আমরা বেকার হয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরি, তখন কি স্যারেরা আমাদের দিকে করুণার চোখে হলেও তাকান? পৃথিবীর যেকোন অধিকার আদায়ের আন্দোলনই গুরুত্বপূর্ণ, সম্মানের। এতে কোন বড়-ছোট নেই। স্যারের কেনো মনে হলো যে ছাত্রদের এই আন্দোলন মানবতা বিরোধি অপরাধীর বিচার বা সৈরশাসকের পতনের চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ?
তিনি এই আন্দোলনের জন্য এম্বুলেন্সের মধ্যে মারা যাওয়া একজন রোগির জন্য হাঁ-হুতাশ করছেন, কিন্তু প্রতিদিন রাস্তাঘাটে যখন দেশের ভি আই পি, মন্ত্রী- এমপিরা বের হয়, তখন যে ঢাকা শহরের রাস্তায় আমাদের মতো সাধারণ জনগনকে গাড়ির মধ্যে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকতে হয়, সেই খবর জাফর ইকবাল স্যার রাখেন? মন্ত্রীদের গাড়ির বহর চলাকালীন সময়ে জ্যামে আটকা পড়ে কতো রোগি এম্বুলেন্সের মধ্যে মারা যায়, তার হিসাব কি জাফর ইকবাল স্যার রাখেন? এই জ্যামে পড়ে মালেশিয়াগামী কতো চাকুরি প্রত্যাশী যুবক তার ফ্লাইট মিস করে সেই খবর কি উনার কান অবধি পৌঁছায়? এই জ্যামে আটকা পড়ে ঠিক সময়ে উপস্থিত না হতে পারার দরুন কতো মানুষের চাকরি চলে যায়, তাও কি উনি জানেন? উনি এসব জানেন না। উনি এসব জানার প্রয়োজনও মনে করেন না। সবচেয়ে বড় কথা, বেকারত্বের অভিশাপ বহন করতে না পেরে কতো যুবক আত্মহত্যা করে, তাদের খতিয়ান কি জাফর ইকবাল স্যারের কাছে আছে আদৌ? তাদের জন্য কি জাফর ইকবাল স্যারের মায়া হয়? দুঃখ হয়? করুণা হয়? কষ্ট হয়? কান্না পায়? পায় না।

জাফর ইকবালরা অন্য মানুষ। এলিট মানুষ। মিষ্টি মিষ্টি আন্দোলনগুলোর সাথে উনারা একাত্ম হন। শ্রেনী সংগ্রামের আন্দোলন থেকে উনারা দূরত্ব বজায় রাখেন সবসময়। ওই যে, উনি বললেন, – ‘যদি আমি জানতাম তারা এরকমটি করবে, তাহলে তাদের দাবির বিষয়ে মন্তব্য করা থেকে একশ হাত দূরে থাকতাম’।
তিনি এক আজব মানুষ। তিনি আসলে একশ হাত নন, হাজার মাইল দূরে আছেন। তবুও তিনি বোঝাতে চান যে, তিনি আছেন, তিনি থাকেন, তিনি থাকবেন। আদতে তিনি ছিলেন না, তিনি থাকেন না, তিনি থাকবেনও না। এই ধ্রুব সত্যিটা আমাদের তরুণ প্রজন্ম যতো তাড়াতাড়ি বুঝবে, ততোই কল্যাণ।

 

3Shares

Check Also

জবির সিএসইর পুননিযুক্ত বিভাগীয় প্রধানের সাথে সফটরিদম কর্মকর্তাদের শুভেচ্ছা বিনিময়

হাফিজুর রহমান:( সফ্টরিদম আইটি থেকে ) জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সাইন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের পুননিযুক্ত বিভাগীয় …

আসলেও ইসলাম কতটা সামাজিক ?

আমাদের সমাজে একটা গোষ্ঠির মাঝে প্রকট একটি ধারণা বাসা বেধে আছে যে সত্যই কি ইসলাম সামাজিক ভাবে উপকৃত? এমন ধারনা তাদের মনে আসার কারনটা ‍খুব বেশি অমূলক নয়। তারা বা আমরা ইসলামকে কতটা জানতে পেরেছি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *