মরা যারা প্রচুর পড়ি কিন্তু মনে থাকেনা বা প্রচুর মনে থাকে কিন্তু কিছুদিন পরে ভুলে যাই এবং মনে থাকেনা কেন এই জন্য আফসোস করি তাদের জন্য এক ঘটনা বলি-

রাশিয়ার এক সাংবাদিক ছিলেন সলোমন শেরেশোভস্কি। ১৮৮৬ সালে জন্ম নেন। সাধারণ মা বাবার সাধারণ ছেলে। বড় হয়ে সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেন। কিন্তু সলোমনের একটা অস্বাভাবিক ক্ষমতা ছিল যা পরে সমস্যায় পরিণত হয়। সেটাকে ডাক্তারি ভাষায় hyperthymesia বলে। যারা প্রচন্ড রকমের স্মৃতিধর ও শ্রুতিধর তাদের ইংরেজিতে নেমোনিস্ট(mnemonist) বলে। নেমোনিস্টরা যে কারণে অস্বাভাবিক পরিমাণ জিনিস মনে রাখতে পারে তাকে hyperthymesia বলে। সলোমন ইতিহাস বিখ্যাত নেমোনিস্টদের একজন হয়ে উঠে। সে তার জীবনের প্রতিটা মিনিটের ঘটনা মনে রাখতে পারত। তার মানে ১০ বছর আগে অমুক তারিখে সে কয় ঘন্টা কয় মিনিট ঘুমিয়েছিল সেটাও মনে থাকত তার। কিছুই ভুলত না।

কোন ইন্টার্ভিউ নিতে গেলে সে দূরে দাঁড়িয়ে একবার পুরা ঘন্টার কথা শুনেই সব মুখস্ত বলে ফেলত। পুরো শিক্ষাজীবনের সব বই আগাগোড়া মুখস্ত তার। কিন্তু ১৯২০ সালে তার উপর গবেষণার জন্য নিযুক্ত বিখ্যাত রাশিয়ান নিউরোসাইকোলজিস্ট আলেক্সান্ডার লুরিয়া বলেন সলোমনের এক প্রকার synesthesia আছে যেটাকে ideasthesia বলা যায়। এটা এমন একটা ব্রেনের সিস্টেম যেটাতে বিভিন্ন নাম্বারের মাধ্যমে কেউ স্মৃতি জমা রাখে (পরের কোন স্ট্যাটাসে এই ব্যাপার নিয়ে বলব)। অর্থাৎ সলোমন হয়ত ১ দেখলে মন্ত্রির ভাষণের কথা মনে পড়ে, ৬ দেখলে হাসপাতালের কোন রোগীর কথা মনে পড়ে, ৯ দেখলে রান্না করা মাংসের কথা মনে পড়ে, ২৩ দেখলে ক্লাস নাইনের বায়োলজি বইয়ের দ্বিতীয় অধ্যায়ের কথা মনে পড়ে ..এরকম।

তবে ডা.লুরিয়া বলেন তার IQ একদম স্বাভাবিক মানুষের মত। এরকম অতিরিক্ত মনে পড়াতে এবং কিছু ভুলতে না পারাতে সলোমন অতিষ্ট হয়ে উঠে। তার কাছে একই মানুষের মুখ সকাল বিকাল ভিন্ন মনে হত। আইসক্রিমের দাম শুনলে মনে হত কয়লা খাচ্ছে। সলোমন চাকরি ছেড়ে দেয়। এই মনে থাকার জ্বালায় সে আত্মহত্যা করার চেষ্টা করে। বিফল হয়। ১৯৫৮ সালে মারা যায় সলোমন। ১৯৯৯ সালে তাকে নিয়ে away with words নামে জাপানী মুভি তৈরী হয়।


সলোমনের মত আরেক জন আছে যে এখনো বেচে আছে। তিনি হলেন আমেরিকার jill price নামক এক মহিলা। ১৯৬৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর তাঁর জন্ম সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়ায়। তাকে নিয়ে প্রচুর ভিডিও আছে ইউটিউবে, দেখে নিতে পারেন। তিনি ২০০৮ সালে নিজের অটোবায়োগ্রাফি লিখেন The Woman Who Can’t Forget নামে। জিল প্রাইস তাঁর ১৪ বছর বয়স থেকে আজ পর্যন্ত প্রতিটা দিনের বর্ণনা দিতে পারেন। তবে জিলের ক্ষেত্রে এই স্মৃতি তাঁর জন্য কোন দুঃখ ডেকে আনেনি সলোমনের মত।

তাই কিছু মনে না থাকলে বেশি আফসোস করবেন না। চেষ্টা চালিয়ে যাবেন। মস্তিষ্ক যতটুকু পারে সে আপনা থেকেই মনে রেখে দিবে। কারো কম মনে থাকলে তিরষ্কার করবেন না। কারণ প্রয়োজনের অতিরিক্ত মনে থাকা কিন্তু মানসিক সমস্যা। কেউ হয়তো আর সলোমন শেরেশোভস্কি হতে চাইবেন না।

লেখকঃ ডাঃ আসির মোসাদ্দেক সাকিব 

পোস্ট সংগ্রহঃ সাদা এ্যাপ্রন থেকে

1Shares