islam
islam

ইতিহাসের মুসলিম গণহত্যা থেকে শিক্ষাগ্রহণ

সময়টা ছিল ৬১৬ হিজরী। তাতারীদের নেতা চেঙ্গিস খান উজিবেকিস্তানের বুখারা অঞ্চল অভিমুখে বিশাল এক বাহিনী নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। মুসলিমদের আমীর খাওয়ারেজম শাহ বুখারা অঞ্চল থেকে বেশ দূরে অবস্থান করছিল। ফলে বুখারার সাধারণ জনগন এহেন সঙ্কট মুহূর্তে তাদের করনীয় নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছিল। জনগনের পক্ষ হতে দু’টো প্রস্তাব উত্থাপিত হলো—
.
১) আমরা তাতারীদের সাথে যুদ্ধ করবো এবং আমাদের শহরকে রক্ষা করব।
২) আমরা তাতারীদের জন্য শহরকে উন্মুক্ত করে দিব, ফলে আমরা নিরাপত্তা লাভ করব।
.
শহরের মানুষ দু’দলে বিভক্ত হয়ে গেল। একদল মুজাহিদ, যারা যুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে এবং শহরের বড় দূর্গে অবস্থান গ্রহণ করে শত্রুদের আক্রমণের জন্য। অপরদিকে আরেক দল হলো আত্মসমর্পণকারী, যারা শহরের মূল দ্বার তাতারীদের জন্য খুলে দেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে এবং তাদের কর্তৃক নিরাপত্তা লাভের স্বপ্নে বিভোর থাকে। এরাই ছিল সংখ্যায় বেশী। 
.
আত্মসমর্পণকারীরা শহরের মূল ফটক তাতারীদের জন্য উন্মুক্ত করে দিল। তারা তাতারীদের নিকট নিরাপত্তা চেয়ে নিজেদেরকে তাদের নিকট সমর্পণ করল। ধোঁকাবাজ চেঙ্গিস খান মুসলিমদের এই দলটিকে নিরাপত্তার মিথ্যে আশ্বাস দিল এবং তারা বিদ্রোহী ছোট মুজাহিদ দলটির দূর্গের চারপাশে অবস্থান নিল। এই কাজে পূর্ণ সহযোগীতা করলো আত্মসমর্পণকারী দলটি। শুধু তাই নয়! দূর্গের চারপাশে খন্দক খননের কাজে তাতারীদেরকে এই দল পূর্ন সহযোগীতা করল, যাতে তারা দূর্গে অবস্থানরত মুজাহিদদের হত্যা করতে পারে, এবং তারা নির্বিঘ্নে যুদ্ধ/জঙ্গ এসব থেকে মুক্ত থেকে বেঁচে থাকতে পারে।
.
অতঃপর দীর্ঘ দশদিন দূর্গ অবরোধ করে তাতারীরা দূর্গের ভেতরে অবস্থানরত সকল মুজাহিদদের হত্যা করলো। একজন মুজাহিদও এই আক্রমণ হতে রেহাই পেল না। তাতারীদের বিপক্ষে কথা বলার একজন ব্যক্তিও আর অবশিষ্ট থাকলো না। অবশেষে চেঙ্গিস খান তার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করল। সে শহরবাসীর কাছ থেকে তাদের ধন-সম্পদ অর্থকরী ছিনিয়ে নিল। সমগ্র বুখারা অঞ্চল তাতারীদের জন্য অবাধ ঘোষনা করল এবং ইতিহাসের নেক্কারজনক হত্যাকান্ড এবং ঘৃন্য কাজের সূত্রপাত ঘটাল। যা ইবনে কাসির (রহ.) এর আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া গ্রন্থে এভাবে বর্ণিত হয়েছে –
.
“তারা এতো বিপুলসংখ্যক মানুষ হত্যা করেছে, যার সঠিক সংখ্যা আল্লাহ ব্যতিত কেউ জানে না। তারা নারী এবং শিশুদের বন্দী করেছে এবং পরিবার পরিজনের সম্মুখেই তাদের সাথে অশ্লীল কার্যকলাপে মেতে উঠেছে। নিতান্তই যারা আত্মরক্ষার্থে লড়াই করতে চেয়েছে তাদের নির্বিচারে হত্যা করেছে। বন্দীদের বিভিন্ন ধরণের শাস্তি দান করেছে। শহরের আকাশ বাতার নারী-পুরুষ ও শিশু-কিশোরদের আর্তনাদে কেঁপে উঠেছে। এরপর তারা বুখারার সমস্ত মসজিদ এবং মাদ্রাসায় আগুন লাগিয়ে দেয়। শহর পুড়ে ভস্ম হয়ে বিরানভূমিতে পরিনত হয়”।
.
আহা! মুসলিমদের শহর বুখারা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হলো। ধৈর্যশীল মুজাহিদ বাহিনী ধ্বংস হলো, যুদ্ধ বিমূখ আত্মসমর্পণকারীরা লাঞ্ছিত হলো। 
.
উম্মুল মু’মিনীর জয়নাব বিনতে জাহাশ (রা.) আল্লাহর রাসূল (সা.) কে জিজ্ঞেস করেন, “‘ইয়া রাসুলুল্লাহ! আমাদের মাঝে নেককার সৎ লোকেরা উপস্থিত থাকলেও কি আমরা ধ্বংস হবো? ’ রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘হ্যা, যখন মন্দ কাজ বৃদ্ধি পাবে’”। [সহীহ মুসলিমঃ ২৮৮০]
.
বুখারা অঞ্চলের মুসলিমদের দ্বারা কোন সব মন্দ কাজ সংঘটিত হয়েছিল, যার ফলে তারা তাদের ভূমিতেই নিহত হলো? ইতিহাসের পাতায় উঠে এসেছে এর চিরন্তন সত্যতা –
.
১) নিজেদের ইজ্জত-সম্মান, দ্বীন-ধর্ম, সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য তারা তরবারী উত্তোলন করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলো।
২) মুসলিমরা কাফিরদের প্রতিশ্রুতিকে সত্য মনে করেছিলো।
৩) যারা মুসলিমদের নিরাপত্তার জন্য যুদ্ধ করতে চেয়েছিলো, তাদের ধরে নিয়ে শত্রপক্ষের কাছে হস্তান্তর করেছিলো।
৪) মুসলমানরা পরস্পর বহু দলে বিভক্ত ছিল এবং নিজারাই নিজেদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত ছিল।
৫) আল্লাহর কিতাব ও রাসুলের সুন্নত দ্বারা বিচার তারা কামনা করতো না।
.
আর এসব কাজ কেবল মন্দই ছিল না, বরং সবচেয়ে ঘৃণ্য ছিল। আর যখন কোনো জনপদে এসব ঘৃণ্য কাজ বেড়ে যায়, তখন এমন কিছু হওয়াই অবশ্যম্ভাবী হয়ে যায়। এভাবেই ৬১৬ হিজরীতেই মুসলিমদের সোনালী বুখারা হয়ে যায় কাফেরদের আস্তানা!
.
তবে কি বুখারা ট্রাজেডি ছিল তাতারীদের কর্তৃক শেষ ধ্বংসলীলা? না, বরং এটা ছিল তাতারীদের প্রথম অভিযান, তুফানের শুরু এবং ধ্বংসলীলাদ সূচনা মাত্র। পরবর্তী হিজরীর ঘটনাসমূহ ছিল আরো রক্তক্ষয়ী এবং আরো শোকার্ত! 
.
বুখারার ট্রাজেডি থেকে আমরা কি শিক্ষা গ্রহণ করবো? নাকি আমাদের ভাগ্যেও এমন নির্মমতা হাতছানি দিচ্ছে? আল্লাহর কাছে পানাহ চাই।
.
[ড. রাগেব সারজানীর ‘তাতারীদের ইতিহাস’ বই থেকে সংগৃহীত, সামান্য পরিবর্তিত ও পরিমার্জিত]

সংগ্রহ: ফেসবুক

0Shares

Check Also

A 5G-Enabled Foldable iPad

৫ জি আইপ্যাড আসছে। 5G-Enabled Foldable iPad

অ্যাপেল এমন একটি প্যাড নিয়ে আসছে যেটা ৫জি নেটওয়ার্ক সাপর্ট করবে । অ্যাপেলের এই নোটকে …

২০১৯ সালে পাঁচটি শহরের আমুল পরিবর্তন আসবে

গত কয়েক যুগ ধরে পরিবর্তন হচ্ছে আমাদের এই পৃথীবির। ১৯০০ সালে পুরো পৃথিবী জুরে মাত্র …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *